নিজস্ব প্রতিনিধি: লোকসভা নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে একাধিকবার বিশেষ বার্তা দিতে দেখা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারাও বেশ কিছুদিন ধরে সেই পথেই হাঁটতে শুরু করেছেন। সেই সূত্রে রবিবার বীরভূমের একটি সভায় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলকে তোপ দেগে বলেন, ''মুসলিমদের আর ভুল বুঝিয়ে বিজেপি থেকে সরানো যাবে না।''
পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে শুভেন্দুর এই বক্তব্য যে অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ তা স্পষ্ট। বীরভূম জেলা তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল অনেক দিন ধরে জেলে রয়েছেন। পঞ্চায়েতে ভোটে বীরভূমে ভাল ফল করা নিয়ে চিন্তিত তৃণমূল। কারণ দলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চরম আকার নিয়েছে। তাই বীরভূমের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছেন। এছাড়া মাঝেমধ্যেই তৃণমূল ছেড়ে অন্য দলে যোগদানের প্রবণতাও বাড়ছে। আর বীরভূমে বিপুল সংখ্যক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের একটা বড় অংশ বহুদিন ধরেই তৃণমূলের উপর বিরক্ত। যেমন বগটুইয়ের ঘটনার পর তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী বিজেপিতে যোগদান করেছেন। এই প্রথম নয়, একুশের বিধানসভা নির্বাচনের আগেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশ তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার লক্ষ্যে বিজেপিতে যোগদান করেছিলেন। তাই রবিবার শুভেন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে যে বার্তা দিয়েছেন তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। রীতিমতো অঙ্ক কষেই তিনি যে এমন বক্তব্য রেখেছেন সেটা স্পষ্ট। তাই এদিন বীরভূমের মুরারইয়ের ওই সভামঞ্চ থেকে শুভেন্দু গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ ও অসমের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, "তৃণমূল বলছে এনআরসি হলে মুসলিমদের নাকি তাড়িয়ে দেওয়া হবে। ওই তিন রাজ্যে দেখান কতজন মুসলিমকে তাড়ানো হয়েছে। এসব বলে সংখ্যালঘু ভাইদের আর বিজেপি থেকে সরানো যাবে না। ফুরফুরা শরীফের পীরজাদাও সেকথা স্বীকার করে নিয়েছেন৷''
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন পশ্চিমবঙ্গে শুধুমাত্র সত্তর শতাংশ হিন্দু ভোটের উপর নির্ভর করে বিজেপির ক্ষমতায় আসা খুবই কঠিন। তাই প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলে থাকেন সেই 'সবকা সাথ, সবকা বিশ্বাস' শব্দবন্ধ ব্যবহার করে রাজ্য বিজেপি নেতাদের বক্তব্য রাখতে দেখা যাচ্ছে। সেই সূত্রে শুভেন্দুকেও বহুবার বলতে শোনা গিয়েছে, ''আমরা রাষ্ট্রবাদী মুসলিমদের সম্মান করি৷'' অর্থাৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে যে তাঁরা দূরে সরিয়ে রাখতে চান না, তা এভাবেই স্পষ্ট করেছেন শুভেন্দু। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন বাংলার সংখ্যালঘুরাও। এই বিষয়টিও বহুবার তুলে ধরেছেন শুভেন্দু। সব মিলিয়ে সংখ্যালঘুদের ফের কাছে টানার বার্তা দিলেন বিরোধী দলনেতা। উল্লেখ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সংখ্যালঘু ভোটের একচেটিয়া দাবিদার হয়ে উঠেছে তৃণমূল। বিভিন্ন নির্বাচনে তৃণমূলের একতরফা জয়ের প্রধান কারণ সংখ্যালঘু ভোট। সেই ভোটব্যাঙ্ক এবার যেভাবেই হোক ভাঙতে চায় বিজেপি।
কিন্তু সেটা কি আদৌ সম্ভব? বিজেপি যতই সংখ্যালঘুদের কাছে টানার বার্তা দিক দেশ জুড়ে বিভিন্ন সময়ে যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে তাতে সংখ্যালঘু সমাজ বিজেপিকে কতটা বিশ্বাস করবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। এনআরসি এবং সিএএ ইস্যুতে সংখ্যালঘু সমাজ বিজেপিকে ভোট দিতে চায় না। পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের বিক্ষিপ্ত কিছু অঞ্চল ছাড়া সংখ্যালঘু সমাজ বিজেপিকে রাজনৈতিক শত্রু বলেই মনে করে। তাই বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব এখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সম্পর্কে সুর বদলানোর চেষ্টা করলেও তাতে কতটা ফল পাওয়া যাবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন