বেজিং: কোভিড ঝড়ে কাবু হয়েছে গোটা বিশ্ব। এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন দেশের উপর৷ ব্যতিক্রম নয় চিনও৷ কোভিডের আগে জনসংখ্যার নিরিখে শীর্ষে ছিল ড্রাগনের দেশ৷ কিন্তু, সেই স্থান হারাতে হয়েছে তাদের৷ ক্রমাগত জনসংখ্যার হ্রাস পাওয়ায় উদ্বেগে পড়েছে চিন প্রশাসন। জন্মহার বাড়ানোর জন্য একাধিক সুপারিশ করছেন সরকারের রাজনৈতিক উপদেষ্টারা৷ তাতে শামিল হয়ে অভিনব পদক্ষেপ করল চিনা কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। তুলে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন বিধি নিষেধ৷ দেওয়া হল অবাধে প্রেম করার অনুমতি৷ কলেজ পড়ুয়াদের প্রেম করার জন্য মঞ্জুর হল সাত দিনের ছুটি৷
বেশ কয়েকটি কলেজ জাতীয় উদ্বেগকে সমর্থন জানিয়ে অনন্য এই পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এপ্রিল মাসে চিনের নয়টি কলেজ পড়ুয়াদের ‘প্রেমে পড়ার জন্য’ এক সপ্তাহ ছুটি দিচ্ছে। এর মধ্যে ফাং মি এডুকেশন গ্রুপই সর্বপ্রথম এই পদক্ষেপ করে। তাদের অধীনস্থ মিয়াংইয়াং ফ্লাইং ভোকেশনাল কলেজ সবার আগে ২১ মার্চ বসন্তকালীন ছুটি ঘোষণা করে। প্রেম সম্পর্ককে প্রাধান্য দিতেই এই ছুটি। এই সময়ের মধ্যে পড়ুয়াদের প্রেমে পড়তে, সম্পর্কের জটিলতা মিটিয়ে নিতে, প্রিয়জনের সঙ্গে একান্তে সময় কাটাতে বলা হয়েছে। সেই ছুটি এবার ১ এপ্রিল থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ‘প্রকৃতিকে ভালবাসতে, জীবনকে ভালবাসতে এবং বসন্তের বিরতি উপভোগ করার মাধ্যমে ভালবাসা উপভোগ করতে’ উৎসাহিত করা হচ্ছে৷
এর পাশাপাশি আরও একটি সিদ্ধান্ত নেয় চিনা প্রাশাসন৷ যাতে মহিলারা আরও বেশি করে সন্তানধারণ করতে পারে৷ নয়া আইনে বলা হয়, মা হতে গেলে আইন অনুযায়ী বিবাহিত না হলেও চলবে। সন্তানধারণের সুবিধা করে দিতেই এই ব্যবস্থা করেছে সরকার।
পড়ুয়াদের কিছু হোমওয়ার্কও দেওয়া হয়েছে৷ তার মধ্যে হল ডায়েরি লেখা, ব্যক্তিগত বিকাশের রেকর্ড রাখা এবং ভ্রমণের ভিডিয়ো তৈরি করা। এই প্রচেষ্টা জন্মহার বৃদ্ধ হিসাবেই দেখা হচ্ছে। দেশে জন্মহার বাড়াতে ২০টিরও বেশি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিন জনসংখ্যা হ্রাসে অনেক কঠিন পদক্ষেপ করেছিল৷
১৯৮০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চিনে একসন্তান নীতি বজায় ছিল৷ এই নীতির মাধ্যমে কড়া হাতে জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে সে দেশের সরকার৷ এই নিয়মে একের বেশ সন্তানধারণের অধিকার ছিল না চিনা নাগরিকদের। কিন্তু এতে নানা সমস্যা তৈরি হয়। একদিকে যেমন লিঙ্গ বৈষম্য দেখা দেয়, অন্যদিকে, দেশের জনসংখ্যা ভারসাম্য়হীন হয়ে পড়ে। মোট জনসংখ্যা তরুণ প্রজন্মের বদলে প্রবীণ নাগরিকের উপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ে৷ যা একটি দেশের অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের জন্য একেবারেই অনুকুল নয়৷
বিপদের আঁচ পেতেই তড়িঘড়ি একসন্তান নীতি থেকে সরে আসে চিন। ২০১৫ সালে প্রথমে দুই সন্তান এবং ২০২১ সালে সর্বাধিক তিনটি সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় চিন সরকার। কিন্তু, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মব্যস্ত জীবনে চিনা তরুণরা পরিবার বৃদ্ধিতে আর আগ্রহীন নন৷ তাঁদের কাছে অর্থনৈতিক দিকটাও বড় হয়ে উঠেছে৷ কারণ, সন্তানপালনের খরচ, জীবনধারণের খরচ, লিঙ্গ বৈষম্যের কথা ভেবেও অনেকের মধ্যে সন্তান ধারণে অনীহা তৈরি হয়েছে। তার উপর, করোনা অতিমারির সময় গৃহবন্দি হয়ে থাকার সময়ও চিনা দম্পতিদের মধ্যে সন্তানধারণে অনীহা তৈরি হয়। এমনকি আজকাল চিনের তরুণ প্রজন্ম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতেও অনাগ্রহী বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে৷
এই পরিস্থিতিতে জন্মহারবৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয়ে ওঠে চিন সরকার। মার্চ মাসে চিনের পিপল'স পলিটিক্যাল কনসাল্টেটিভ-এর বার্ষিক কনফারেন্সে জন্মহারবৃদ্ধির বিষয়টি ওঠে আসে। সেখানে বলা হয়, এবার থেকে শুধুমাত্র দ্বিতীয় সন্তানের জন্য নয়, তৃতীয় সন্তানধারণের ক্ষেত্রেও নাগরিকদের ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা হবে। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচের কথা ভেবে যাতে মা-বাবারা সন্তান ধারণের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে না আসা৷ কারণ, দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে সরকারি শিক্ষা বিনামূল্যে পৌঁছে দেওয়া হবে৷ পাশাপাশি মেয়েদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়েও জোর দেওয়া হয়৷

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন