কলকাতা: বাংলা নববর্ষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির আবেগ। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালির কাছে আজ উৎসবের দিন। আজ বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন। এই দিনটিকে আমরা পয়লা বৈশাখ হিসাবেও পালন করে থাকি। সাধারণত, এপ্রিল মাসের ১৪ কিংবা ১৫ তারিখে বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন শুরু হয়৷ তবে এই বাংলা ক্যালেন্ডারের ইতিহাস নিয়ে রয়েছে বিস্তর বিতর্ক৷ আকবর নাকি শশাঙ্ক? কৃতিত্ব কার?
বঙ্গাব্দের সূচনা নিয়ে নানা মত রয়েছে। বলা হয়, প্রাচীন বঙ্গদেশের রাজা শশাঙ্ক আনুমানিক ৫৯০-৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে একজন সামন্ত রাজা। পরবর্তীকালে তিনি সার্বভৌম গৌড়ের শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন৷ বলা হয়, ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে রাজা শশাঙ্ক মারা যাওয়ার ৪৫ বছর আগে বঙ্গাব্দ চালু হয়৷
অপর একটি তত্ব অনুযায়ী, বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রচলন করেছিলেন সম্রাট আকবর৷ বাংলা জয় করার পর সম্রাট আকবর তার প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিলেন বঙ্গে। তারা তত্ত্ব তল্লাশ করে দেখেন যে বাংলায় খাজনা আদায়ের জন্য নতুন একটি ক্যালন্ডার প্রয়োজন৷ সেই সময় কর আদায় হত ইসলামী বা হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। যা তৈরি হয়েছিল মূলত চান্দ্র মাসের উপর নির্ভর করে। আর চান্দ্র বছর ছিল সৌর বছরের তুলনায় ১১/১২ দিন কম৷ ফলে ফসল উত্পা১দনের সময়ের সঙ্গে ইসলামী ক্যালেন্ডারের মিল না থাকায় কৃষকরা কর প্রদানে গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হয়। এই সমস্যার সমাধানে সম্রাট আকবরের সময় চান্দ্র ও সৌর ক্যালেন্ডারের সমন্বয়ে একটি পরিশোধিত ক্যালেন্ডার তৈরি করা হয়। যাতে ভারতের বৈচিত্র্যময় মরসুমের ইঙ্গিত বিদ্যমান। কথিত আছে, প্রাথমিকভাবে এই ক্যালেন্ডারের নামকরণ ফসলি সন অর্থাত ফসল কাটার সন রাখা হয়৷ পরবর্তীতে তা বাংলা সন হিসাবে পরিচিত হয়। বাংলা ক্যালেন্ডারে ১২টি ও ৬টি ঋতু বিদ্যমান। বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিন এবং বাকি সাত মাস আশ্বিন থেকে চৈত্র ৩০ দিন রাখা হয়৷ অধিবর্ষে ফাল্গুন মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যুক্ত হয়। মোট ৩৬৫দিন।
আবার ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি, আকবরের পঞ্জিকার নাম ছিল 'তারিখ-এ-এলাহি৷ এই পঞ্জিকায় মাসগুলোর নাম ছিল আর্বাদিন, কার্দিন, বিসুয়া, তীর ইত্যাদি। আকবরের ‘তারিখ ইলাহি’র প্রবর্তনকাল ছিল ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ মার্চ। তবে ঠিক কখন এবং কী ভাবে এই নাম পরিবর্তন হয়ে বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ হয় তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না৷
আকবরের আমলে প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে বকেয়া খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। আর পয়লা বৈশাখে জমিদাররা প্রজাদের মধ্যে মিষ্টান্ন বিতরণ করতেন, তাঁদের আপ্যায়ন করতেন। সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে উৎসবের মুশুম। সম্রাট আকবরের আমল থেকে হালখাতার প্রচলনও হয়৷ জমি, কৃষিকাজ, খাজনা ও ব্যবসার হিসেব করার জন্য শুরু হয় হালখাতা৷

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন