মুম্বই: তিনি বাংলার মহাগুরু৷ তিনিই আবার ডিস্কো কিং৷ তিনি সুপারস্টার মিঠুন চক্রবর্তী৷ যাঁর স্টারডম খুব কাছ থেকে দেখেছে আশির দশকের টিনলেস টাউন৷ তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী৷ অথচ মিঠুন যখন সাফল্যের মধ্যগগনে বিরাজ করছেন, তখন সোশ্যাল মিডিয়া বলে কিছু ছিল না৷ জনসংযোগ মাধ্যমের চলও চোখে পড়ে না। কিন্তু এর জন্য তাঁর জনপ্রিয়তায় কোনও খামতি ছিল না৷ শুধু মিঠুনই নন, সমসাময়িক বা তার আগেও তারকাদের অনুরাগী সংখ্যায় কোনও ভাটা পড়তে দেখা যায়নি৷ জিতেন্দ্র থেকে রাজেশ খান্না, বিনোদ খান্না, অমিতাভ বচ্চন, সঞ্জীব কুমারের মতো তারকা কারোরই আলাদা করে কোনও জনসংযোগ আধিকারিক ছিলেন না। তবে বলিপাড়ায় জনপ্রিয়তার নিরিখে যদি কেউ নজির গড়ে থাকেন, তাহলে তিনি মিঠুন চক্রবর্তী।
আশির দশকে বলিপাড়ার সকল তারকার জনপ্রিয়তাকে যেন ম্লান করে দিয়েছিল মিঠুন ম্যাজিক। তিনি কোথাও শুটিং করতে গেলে সেটের বাইরে দেখা যেত বিপুল সমাগম৷ ভিড় সামলানোই হত বড় দায়৷ এমনকি, দেশের বাইরেও অভিনেতার অনুরাগীদের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মত৷
১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় মৃণাল সেন পরিচালিত ‘মৃগয়া’৷ ওই ছবির মধ্যে দিয়েই বলিপাড়ায় পা রাখেন মিঠুন। কিন্তু, ওই ছবিতে তাঁকে নিয়ে যত না শোরগোল পড়েছিল, অনেক বেশি মাতামাতি শুরু হয় তার ঠিক ছয় বছর পর।
১৯৮২ সালে সিলভার স্ক্রিনে মুক্তি পায় ‘ডিস্কো ডান্সার’৷ সেই ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি মিঠুনের নাচের দৃশ্যগুলি ঝড় তোলে। অনুরাগীদের কাছে মিঠুন পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘ডিস্কো ডান্সার’ নামে৷ তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু ভারতে নয়, বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে৷ সুদূর রাশিয়াতেও গড়ে ওঠে মিঠুনের ফ্যান ক্লাব। শোনা যায়, মিঠুন যখন কাজাখস্তানে শুটিংয়ের জন্য গিয়েছিলেন, তখন তাঁকে দেখার জন্য বিমানবন্দরে এসে হাজির হয়েছিলেন অনুরাগীরা।
কাজাখস্তানের বিমানবন্দর থেকে মিঠুন যখন বাইরে বেরচ্ছেন, তখন গেটের বাইরে জনস্রোত। কানাঘুষো, সে দিন বিমানবন্দরের বাইরে নাকি প্রায় দশ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। বিদেশের মাটিতে কোনও বলিউড তারকার এতটা জনপ্রিয়তা, এমন উন্মাদনা আর কোনও তারকার ক্ষেত্রে ঘটেনি বলেই বলিপাড়ার একাংশের অনুমান।
জনপ্রিয়তার শিখর ছোঁয়ার পরও এক সময় একাকিত্ব গ্রাস করেছিল মিঠুনকে। এক পুরনো সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই সে কথা জানিয়েছিলেন৷ কেরিয়ারে এমন সময়ও গিয়েছে যখন তিনি এক দশকে একশোরও বেশি ছবিতে কাজ করেছেন। এমনও দিন গিয়েছে যখন, দিনে ৪ থেকে ৫টি ছবির শুটিং করেছেন৷ এক কথায় প্রচুর কাজের চাপ৷ ওই সাক্ষাৎকারে মিঠুন বলেছিন, ‘‘আমি কোনও দিন ভাবতে পারিনি যে এত বড় তারকা হতে পারব। কিন্তু আমার জনপ্রিয়তা যত বৃদ্ধি পেয়েছে, আমি তত একা হয়ে পড়েছি।’’
তাঁর কথায়, “যখন দেশের পয়লা নম্বর তারকা হয়ে উঠেছিলাম, তখন ভাবতাম হা ঈশ্বর, কী একা লাগছে নিজেকে। সত্যিই ভীষণ একাকী কাটিয়েছি সেই বছরগুলো। কেউ আশেপাশে নেই। সবাই বলত, দাদার কাছ থেকে দূরে থাকো। ও অনেক উঁচুতে উঠে গিয়েছে। এমনকী বন্ধুরাও তখন আমার থেকে দূরত্ব তৈরি করে নিল। খুব অদ্ভূত একটা পরিবেশ৷ রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠতাম, শুটে যেতাম, আবার বাড়ি ফিরে এসে সেই একাকী জীবন৷ জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেও এতটা একাকীত্ব ভোগ করতে হয়েছে।”
তবে মিঠুনের কথায়, ‘‘ভাল অভিনেতার পাশাপাশি ভাল মানুষ হতে না পারলে দর্শকের মনে জায়গা পাওয়া যায় না। ইন্ডাস্ট্রিতেও দীর্ঘ দিন থাকা যায় না।’’ তিনি মনে করেন, ‘‘দক্ষতা ছাড়া অভিনয় করা যায় না। দক্ষতা থাকলে পৃথিবীর কারও আটকানোর ক্ষমতা নেই। এক জন দক্ষ অভিনেতা যদি ভাল মানুষ না হন, তা হলে ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর আয়ু অল্প।’’

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন