বারাসত: ধৃতকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই ইঙ্গিত মিলেছিল। তদন্ত আরও কিছুটা এগতেই স্পষ্ট হল, কিডনি পাচারের একটি বড়সড় চক্রের সঙ্গে যোগ রয়েছে অশোকনগরের ধৃত সুদখোর বিকাশ ঘোষের।
পুলিস জানতে পেরেছে, বিকাশের ফাঁদে পা দিয়ে প্রায় ৫০ জন তাঁদের কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে ১০ জনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণও হাতে এসেছে তদন্তকারীদের। ধৃত নিজে এবং একাধিক কিডনিদাতা সেই কথা স্বীকার করছেন বলে পুলিসের দাবি। তদন্তকারীরা বিকাশকে জেরা করে আরও জেনেছেন, কিডনি পিছু পাঁচ-সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়া হতো দাতাদের। কিন্তু সেই কিডনি বিক্রি হতো ২৫-৩০ লক্ষ টাকায়। এর জন্য মোটা অঙ্কের কমিশন পেত সে। এই কারবারে বিকাশ শুধু স্থানীয় এজেন্ট, পিছনে আন্তর্জাতিক কোনও চক্র জড়িত থাকতে পারে বলেও মনে করছেন তদন্তকারীরা।
হতদরিদ্র মানুষকে ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে তাঁদের কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য করত বিকাশ। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের টাকা মেটাতে নাস্তানাবুদ হয়ে ঋণগ্রহীতাদের যখন অসহায় ও দিশেহারা অবস্থা, তখন বিকাশ টাকার জন্য তাদের কিডনি বিক্রি করতে প্ররোচিত করত বলে অভিযোগ। জেরায় পুলিসকে বিকাশ জানিয়েছে, সে সাধারণত এক লক্ষের কম টাকা ধার দিত। বাৎসরিক সুদের হার ছিল ৩৬০ শতাংশ! এই হারে সুদ মেটাতে অনেকেই পারতেন না। তখনই শুরু হতো চাপ দিয়ে কিডনি বিক্রি করতে রাজি করানোর প্রক্রিয়া। কোনও উপায় না পেয়ে নিজের বা কোনও প্রিয়জনের কিডনি দিতে রাজি হয়ে যেত অনেকে। এভাবে অশোকনগরের এক দম্পতিকে চাপ দিয়ে সে দু’জনেরই কিডনি বিক্রি করিয়েছিল বলে জেরায় জানিয়েছে বিকাশ। এই কারবারে উত্তরপ্রদেশের এক দালাল এবং বিকাশের অধীনে একাধিক ‘এজেন্ট’ও কাজ করত।তারাও ইতিমধ্যে পুলিসের নজরদারির আওতায় চলে এসেছে বলে খবর।
পুলিস সূত্রে দাবি, এই ‘এজেন্ট’রাও একই কৌশলে গরিব মানুষকে সুদের ফাঁদে জড়িয়ে শেষ পর্যন্ত কিডনি বিক্রি করার জন্য রাজি করাত। কিন্তু নিয়ম হল, সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে নির্দিষ্ট কিছু নথি জমা দেওয়ার পর দাতার শরীরে অস্ত্রোপচার পরে কিডনি বার করে তা গ্রহীতার দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়। এক্ষেত্রে নিয়মটি বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। কারণ, কিডনি দান করতে চাই বললেই অনুমতি মেলে না। তার জন্য আদালত থেকে উপযুক্ত নথি জোগাড় করতে হয়। পাশাপাশি, মহকুমা স্তরে ‘ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন’ করেন স্বাস্থ্য ও প্রশাসনের আধিকারিকরা। তারপর মেলে ছাড়পত্র। সেই সঙ্গে কিডনি দানের প্রধান শর্তই হল, কোনওভাবে আর্থিক লেনদেন করা যাবে না। এত যেখানে নিয়মের কড়াকড়ি, সেখানে কীভাবে এতদিন ধরে সক্রিয় থাকল ধৃত বিকাশ সহ কিডনি পাচার চক্র? তদন্তকারীরা বলছেন, এর পিছনে রয়েছে একটি চক্র। তাই গত দু’বছরে উত্তর ২৪ পরগনা স্বাস্থ্য জেলার কতজন কিডনি দান করেছেন, সেই রিপোর্ট সংগ্রহ করছে পুলিস। তারপর কিডনিদাতাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানতে চাওয়া হবে, তাঁদের সঙ্গে বিকাশের কোনও যোগাযোগ হয়েছিল কি না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন