কলকাতা: ধর্মের নামে সঙ্কীর্ণ রাজনীতির অভিযোগ শাসক বিরোধী চাপানউতোরে পরপর তিনদিন উত্তাল হয়ে উঠল রাজ্য বিধানসভার অধিবেশন। তৃতীয় দিনে যুযুধান দুই পক্ষের সেনাপতিদের তুমুল দ্বন্দের সাক্ষী রইল বিধানসভা। মুখ্যমন্ত্রী-বিরোধী দলনেতা তো বটেই নিজ নিজ শিবিরের হয়ে এদিন মাঠে নামেন একাধিক বিধায়ক।
এদিন আচমকাই অধিবেশেন আসেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি বিধায়করা একরকমভাবে তৈরিই হয়ে এসেছিলেন। কালো পোশাকে এদিন বিধানসভা কক্ষে প্রবেশ করেন বিজেপি বিধায়করা। বিধানসভায় বিক্ষোভ দেখাবেন বলে ঠিক করেছিলেন আগেই। আর সেই আবহেই বিধাসভায় উপস্থিত হন মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার বিধানসভার বাইরে শুভেন্দু অধিকারী বিতর্কিত মন্তব্য করেন।
তিনি জানান, ২০২৬ সালে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের বিজয়ী মুসলিম বিধায়কদের ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে।
সেই নিয়ে এদিন উত্তাপ ছড়ায় অধিবেশনে। মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গেলে শঙ্কর ঘোষ-সহ বিজেপি বিধায়করা তুমুল হইহট্টোগোল শুরু করেন। বক্তব্য থামিয়ে ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীদের বলার সুযোগ দেন। সেই সময়েই চরমে ওঠে বাক-বিতণ্ডা। রোজ রোজ বিধানসভায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি নিয়ে বিজেপি-কে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, বিজেপি ধর্মীয় কার্ড খেলছে বলেও অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, মানবিকতা সবচেয়ে বড়। ধর্ম দিয়ে কিছু হয় না। মানুষের মতন আচরণ করতে হয়। কোনও ধর্মকে অপমান করা যায় না বলেও বিজেপি-র উদ্দেশে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিন প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পর তৃণমূলের বিধায়করা শুভেন্দুর ওই মন্তব্যের বিরোধিতা করেন। শুভেন্দুর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। মন্ত্রী গোলাম রব্বানি বলেন, 'শুভেন্দু যে মন্তব্য করেছেন, তা দেশের সংবিধানের পরিপন্থী। তাঁর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হোক।' গোলামের বক্তৃতা চলাকালীনই বিধানসভার অধিবেশন কক্ষে ঢোকেন। তাঁকে দেখে তীব্র চিৎকার শুরু করে দেন বিজেপি বিধায়করা। এর পর মমতা বক্তৃতা শুরু করলে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন বিজেপি বিধায়করা।
সেই পরিস্থিতিতেই নিজের বক্তৃতা চালিয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'যেভাবে একটা ধর্মকে আক্রমণ করা হচ্ছে, যেভাবে মুসলিম ধর্মের নাম করে বিরোধী দলনেতা আক্রমণ করছেন, তা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিরোধী দলনেতা সাসপেন্ডেড। কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি যে মন্তব্য করছেন, তাও বিরোধী দলনেতার মন্তব্য হিসেবেই ধরতে করেন মমতা। নিজে তিন-তিন বার দল বদল করেছেন, ভবিষ্যতে কী করবেন, বিজেপি-র সভাপতি হতে দৌড়াদৌড়ি করছেন বলে কটাক্ষ ছুড়ে দেন। বিজেপি-র কাছ থেকে ধর্ম শিখবেন না, তাদের আমদানি করা ধর্ম শিখতে আগ্রহী নন
বলে জানিয়ে দেন। ফিরহাদ হাকিম, হুমায়ুন কবীর, সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীদের মন্তব্যের ব্যাখ্যা কী, পাল্টা প্রশ্ন তোলেন বিজেপি বিধায়করা।
এর পাল্টা মমতা বলেন, 'ফিরহাদকে বলা হয়েছে এমন মন্তব্য না করতে। বাকিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ধর্ম বিজেপি-র কাছে শিখব না।' এতে আরও উত্তাল হয়ে ওঠে বিধানসভা। বিধানসভা থেকে ওয়াক আউট করেন বিজেপি বিধায়করা। রাজ্যের তৃণমূল সরকার 'হিন্দু বিরোধী' বলে স্লোগান ওঠে।
এতে অতীতে মমতার নেতৃত্বে বিধানসভা ভাঙচুর হয় বলে অভিযোগ করেন বিজেপি-র শঙ্কর ঘোষ। এই ধরনের মন্তব্য বিধানসভায় করা যায় না বলে পাল্টা শঙ্করকে জানান স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু বিজেপি-কে আক্রমণ করে যান মমতা। তিনি বলেন, 'আমি নিজে হিন্দু। আমার বাড়িতে কালীপুজো হয়, সব ধরনের পুজো হয়। আপনারা ধর্মীয় কার্ড খেলছেন। মানবিকতা সবচেয়ে বড়। ধর্ম দিয়ে কিছু হয় না। মানুষের মতন আচরণ করতে হয়। কোনও ধর্মকে
অপমান করা চলতে পারে না। জালিয়াতি করবেন না ধর্মের নামে।' নাম না করে শুভেন্দুকে তীব্র আক্রমণ করেন তিনি।
অন্য দিকে, বিধানসভার বাইরে শঙ্কর বলেন, 'বিরোধী দলনেতাকে সাসপেন্ড করে নিজের ভোটব্যাঙ্ক, অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের তুষ্ট করতে এখানে এসেছেন। ওঁর দলের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম ধর্মান্তরণের কথা বলেছিলেন, মিনি পাকিস্তানের কথা বলেছিলেন। ওঁর দলের বিধায়ক হামিদুল ৩০ শতাংশ হিন্দুকে কাটিয়ে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা। ওঁর দলের মন্ত্রী জনসংখ্যা বৃদ্ধি করে হিন্দুদের ছাপিয়ে যেতে হবে বলেছিলেন। সেই মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারের মর্যাদার কথা মনে পড়েনি। হঠাৎ করে বিরোধী দলনেতার চেয়ারের মর্যাদার কথা মনে পড়েছে। বিরোধী দলনেতার অপরাধ, তিনি তৃণমূলের দুর্নীতির মুখোস খুলে ফেলেছেন, পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশ বানাতে বাধা দিচ্ছেন, হিন্দুদের হয়ে কথা বলছেন, তাই বিরোধী দলনেতাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। উনি (মমতা) তুষ্টিকরণের রাজনীতি করছেন। উত্তর
দিতে না পেরে বলছেন দলের মন্ত্রীদের বলেছি।'

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন