কেন একই বংশে কেউ সুবুদ্ধির, আবার কেউ দুর্বুদ্ধির অধিকারী হয়—এটি একটি জটিল প্রশ্ন, যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের মানবজীবনের গভীরে প্রবেশ করতে হবে, যেখানে জিন, পরিবেশ এবং অভিজ্ঞতার এক জটিল জাল বোনা থাকে।
আমাদের চারপাশেও এমন অনেক উদাহরণ দেখা যায়, যেখানে বাবা-মা ধার্মিক ও সৎ হওয়া সত্ত্বেও সন্তান বিপথে চালিত হয়, অপরাধ জগতের ‘ডন’ হয়ে ওঠে।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, কেন এমন হয়? ‘দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ’ অথবা ‘গোবরে পদ্মফুল’ হয়ে জন্মানোর রহস্য কী? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের জানতে হবে জিন এবং পরিবেশ কীভাবে মানুষের স্বভাব ও চরিত্রকে প্রভাবিত করে।
বিজ্ঞান বলে, প্রতিটি মানুষ নিজস্ব জিন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই জিন একজন ব্যক্তির বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্য বহন করে। কিন্তু একজন মানুষ কেবল তার জিনের সমষ্টি নয়। সে বেড়ে ওঠে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে, যেখানে তার চারপাশের পরিস্থিতি, মানুষের সঙ্গ এবং জীবনের অভিজ্ঞতা তার মন ও মানসিকতাকে প্রভাবিত করে।
শিশুকাল থেকেই একজন মানুষের ভাবনাচিন্তা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা এবং স্বভাবের ওপর জিন এবং পরিবেশ উভয়েরই প্রভাব থাকে। বংশানুক্রমিকভাবে পাওয়া বৈশিষ্ট্যকে জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বলা হয়। কিন্তু এই জিনগত বৈশিষ্ট্যকে পরিবেশের মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘এপিজেনেটিক’।
এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে পরিবেশ জিনকে বদলায়? বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে জিনের প্রভাব বেশি, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব বেশি। মানুষের মস্তিষ্কের দুটি অংশ—প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং অ্যামিগডালা—জিন এবং পরিবেশ দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। এই দুটি অংশের সঙ্গে কিছু নিউরোট্রান্সমিটার, যেমন ডোপামিন ও সেরোটোনিন যুক্ত হয়ে মানুষের স্বভাব ও চরিত্রের বৈশিষ্ট্য তৈরি করে।
মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে মানসিক পার্থক্য কেন দেখা যায়, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নিউরোসায়েন্স, জেনেটিক এবং এপিজেনেটিক—এই তিনটি বিষয় এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই তিনটি উপাদানের মধ্যে কোনটি কার জীবনে প্রধান হবে, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কেউ খুব সাবধানী, কেউ ঝুঁকি নিতে পছন্দ করে, আবার কেউ জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
আমাদের চারপাশের কঠিন পরিস্থিতি, মানসিক চাপ এবং পরিবেশ আমাদের স্বভাবকে প্রভাবিত করে। একটি শিশু একান্নবর্তী পরিবারে বেড়ে উঠুক বা নিউক্লিয়ার পরিবারে—তার চারপাশের পরিবেশ তার মানসিক বিকাশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে মা-বাবা খুব কঠোর নিয়মের মধ্যে বড় হয়েছেন এবং নিয়মানুবর্তী হয়েছেন, কিন্তু তাদের সন্তানকে কিছুটা স্বাধীনতা দিয়েছেন, ফলে সন্তান আর সেই নিয়মশৃঙ্খলার ধার ধারেনি।
বিজ্ঞান বলছে, জিন, মস্তিষ্কের রসায়ন এবং পারিবারিক অভিজ্ঞতা—এই সবকিছুর যোগফল একটি মানুষের স্বভাব ও চরিত্র গড়ে তোলে। তাই মা-বাবা যেমন, সন্তানও তেমন হবে—এমন কোনো কথা নেই।
খারাপ জিন ভালো পরিবেশে এবং ভালো জিন খারাপ পরিবেশে থাকলে কী হতে পারে? এক্ষেত্রে ‘জেনেটিক লোডিং’ নামক একটি বিষয় সামনে আসে। পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার—এই ধরনের কিছু সমস্যার ক্ষেত্রে জিনের প্রভাব বেশি থাকে।
যাঁর মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য ভালো, তিনি যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু যাঁর মস্তিষ্কে এই ভারসাম্যের অভাব রয়েছে, তিনি তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। তাই বংশে যদি এ ধরনের সমস্যা থাকে, তবে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই একটি উত্তম পরিবেশ, সঠিক মূল্যবোধ এবং উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া উচিত। সেইসঙ্গে কাউন্সেলিং, থেরাপি এবং কিছু ক্ষেত্রে ঔষধের প্রয়োজন হতে পারে। এর মাধ্যমে জিনগত প্রভাবকে ছাপিয়ে পরিবেশগত প্রভাবকে বড় করে তোলা সম্ভব।
সহোদর ও যমজ সন্তানের মধ্যেও স্বভাবের ভিন্নতা দেখা যায়। এর কারণ হলো, বাবা-মায়ের মধ্যে যাঁর জিনের প্রভাব সন্তানের ওপর বেশি, সন্তানের স্বভাবে সেই বৈশিষ্ট্য বেশি প্রকাশ পায়। এছাড়াও, নিউরোট্রান্সমিটারের মাত্রা, পরিবেশ এবং অন্যান্য মানুষের প্রভাবও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন