কলকাতা: আতঙ্কের আরেক নাম ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’! এত দিনে আম জনতা জেনে গিয়েছে, এই ‘অ্যারেস্ট’ আদতে আর্থিক প্রতারণার ফাঁদ। সেই ফাঁদে একবার পা দিলে মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে যেতে পারে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। এই জালিয়াতিতে প্রতারকদের প্রধান হাতিয়ার হল ভুয়ো আইপি অ্যাড্রেস। এর ফলে প্রতারকদের সঠিক লোকেশন চিহ্নিত করাই দুষ্কর হয়ে ওঠে। এবার সেই বাধা অতিক্রম করতে চলেছে কলকাতা পুলিস। সৌজন্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নির্ভর দু’টি সফ্টওয়্যার। এর সাহায্যে ভুয়ো আইপি’র ‘আসল উৎস’ খুঁজে পাওয়া কার্যত জলভাত হয়ে যাবে পুলিসের কাছে। সেই সঙ্গে গলার স্বর নকল করে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা রুখে দেওয়া সম্ভব হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, গত এক বছরে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ফাঁদে পড়ে পুলিসের দ্বারস্থ হয়েছেন দেশের প্রায় ৯২ হাজারের বেশি মানুষ। এখনও পর্যন্ত তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে খোয়া যাওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এই কৌশলে জালিয়াতি এখন লালবাজারের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। কারণ, গত এক বছরে শুধু কলকাতায় হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। ৭৫ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ‘ডিজিটাল পুলিস’। পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতা পুলিসের সাইবার বিভাগকে ঢেলে সাজার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সিপি মনোজকুমার ভার্মা।
সূত্রের খবর, কলকাতা পুলিসের সাইবার থানাকে ভেঙে ছ’টি শাখা গঠন করা হবে। এর মধ্যে সাইবার ফরেন্সিক ল্যাবরেটরিতে ‘ইনস্টল’ করা হবে এআই নির্ভর দু’টি সফ্টওয়্যার। পদস্থ এক পুলিসকর্তা বলেন, ‘গোপনীয়তার স্বার্থে এই সফ্টওয়্যারের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। ডিজিটাল অ্যারেস্টের নামে প্রতারণা রুখতে বিশেষভাবে এই সফ্টওয়্যার প্রস্তুত করা হচ্ছে।’ মাসখানেকের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এর ব্যবহার শুরু হয়ে যাবে বলে জানান তিনি।
সফ্টওয়্যার দু’টির কাজ কী? খবরে প্রকাশ, এয়ারপোর্টে পার্সেল বা মাদক আটকের ভয় দেখিয়ে টাকা হাতানোর ক্ষেত্রে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি প্রতারকরা। এ যাবৎ অভিযোগগুলি পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে, অন্তত ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর টোপ দিয়ে প্রবীণ নাগরিকদের টার্গেট করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতারকরা এআই নির্ভর বিশেষ অ্যাপ কাজে লাগিয়ে পরিবারের কোনও সদস্যের কণ্ঠস্বর নকল করছে, যাকে বলে ‘ভয়েস ক্লোনিং’। এই বৈশিষ্ট্যকেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিডিও কলের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই কাজ হচ্ছে ভুয়ো আইপি অ্যাড্রেসের সাহায্যে। ফলে প্রতারক বাড়ির পাশে বসে থাকলেও তার ‘লোকেশন’ বিদেশ বা অনেক দূরে কোথাও দেখাচ্ছে। এই কারসাজি আটকাতে পুলিসের সফ্টওয়্যারে বিশেষ ‘প্রোগ্রামিং’ যুক্ত করা হয়েছে। এর সাহায্যে গোয়েন্দারা সহজেই জানতে পারবেন, কোন অ্যাপ কাজে লাগিয়ে ভয়েস ক্লোন করা হয়েছে এবং তা আসলে কোন আইপি অ্যাড্রেস থেকে ‘আপলোড’ হয়েছে। কলকাতা পুলিসে একাধিক বিশেষজ্ঞ থাকলেও এই অত্যাধুনিক সফ্টওয়্যার ব্যবহারের জন্য প্রায় ১৫০ জন সাইবার বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ করা হবে বলে জানা গিয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন