মন্দিরের দেশ মল্লভূম আমাদের এই রাজ্যেই। বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের চারপাশে বিস্তীর্ণ ছিল এই রাজ্য। আজ বাঁকুড়া জেলার অন্যতম মহকুমা শহর হলেও বিষ্ণুপুর একসময় মল্লরাজাদের গৌরবময় রাজধানী ছিল। মল্লরাজাদের রাজধানী বিষ্ণুপুরের রাজারা সপ্তম শতাব্দী থেকে প্রায় বারশ বছর রাজত্ব করেছেন। এখানকার রাজাদের অমর কাহিনী ছড়িয়ে রয়েছে সারা দেশে। মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরও বলা হয় শহরটিকে। কারণ সারা শহর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে মন্দির। আর রাজা বীর হাম্বির তথা হাম্বিরমল্লের আমলে এখানে গড়ে ওঠে প্রচুর মন্দির। মন্দিরের টেরাকোটার আকর্ষণ অবর্ণনীয়। যদিও মন্দিরগুলির মধ্যে অনেক মন্দিরের আজ জীর্ণ দশা। মন্দিরের শিল্পকলার টানে আজও পর্যটকরা ভিড় করেন ঐতিহাসিক এই শহরে। আসেন বিদেশী পর্যটকেরাও। এটা উল্লেখ করাও বাহুল্য হবে না যে, বিষ্ণুপুর সঙ্গীত ঘরানা একসময় ভারতীয় সঙ্গীতের বহুল চর্চিত বিষয় ছিল। এখানকার সঙ্গীত বিশারদদের মধ্যে যদুভট্ট, গোপেশ্বর বন্দোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামী প্রমুখরা ছিলেন দিকপাল। যাইহোক, আমাদের বিষয় বিষ্ণুপুরের ঐতিহাসিক রাসমঞ্চ ঘিরে। এ এক অতুলনীয় স্থাপত্য।
বিষ্ণুপুরের রাসমঞ্চটি দেখার মতো। বিখ্যাত এই রাসমঞ্চ নির্মাণ করেন হাম্বিরমল্ল, ১৬০৯ সালে। বৈষ্ণব ধর্মের প্রসারের জন্য ষোড়শ শতকে রাজা বীর হাম্বীর বিষ্ণুপুরে এই স্থাপত্য তৈরি করেছিলেন। রাসমঞ্চ ছাড়াও পাশাপাশি রয়েছে তিনটি বিখ্যাত মন্দির – জোড়বাংলা, শ্যামরাই এবং রাধেশ্যাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, রাসমঞ্চের ছবিই রাজ্য পর্যটন দফতরের ওয়েবসাইটে বিষ্ণুপুরের পাতার ‘ব্যানার’।
১৬০৯ সালে নির্মিত মল্লরাজ বীর হাম্বীর বিষ্ণুপুরে যে রাসমঞ্চটি নির্মাণ করেছিলেন, সেটি এক অভূতপূর্ব স্থাপত্যকলার নিদর্শন। এই মঞ্চটিতে বাংলার সনাতন মন্দির স্থাপত্যের সঙ্গে মিশরীয় পিরামিড ও ইসলামী স্থাপত্যশৈলী মিশে দেখা যায়।
এহেন রাসমঞ্চের নির্মাতা রাজা বীর হাম্বীর সম্বন্ধে দু এক কথা জেনে নেওয়া যাক। তিনি ছিলেন এক বীর যোদ্ধা যিনি বৈষ্ণব ধর্মে নিমজ্জিত হতে যান পরবর্তীকালে। তিনি ছিলেন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সমসাময়িক এবং মুঘল-পাঠান সংঘর্ষে মুঘল বাহিনীর অন্যতম সহায়ক। এই দুর্ধর্ষ মল্লযোদ্ধাই শ্রীনিবাস আচার্যের কাছে বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত হন। এরপরই তিনি নির্মাণ করেন অসংখ্য মন্দির। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব মল্লভূমকে গুপ্ত বৃন্দাবন বলে ডাকতেন। বীর হাম্বীরের শ্রেষ্ঠ নির্মাণ এই রাসমঞ্চ।
রাসমঞ্চটি একটি চওড়া বেদীর উপর নির্মিত। বেদীটি নির্মিত হয়েছে মাকড়া পাথর দিয়ে। তাকে চারপাশে ঘিরে আছে তিন প্রস্থ খিলানযুক্ত দেওয়াল। বেদীটি কার্ণিশের চারদিকে সমান। বেদীর উচ্চতা ১.১ মিটার, প্রস্থ ২৪.৫ মিটার। রাসমঞ্চটির উচ্চতা ১২.৫ মিটার। মাথাটি একটি স্বল্প পরিসর ছাদের মতো। সিঁড়ির ধাপের মতো উঠে গেছে চার দিক দিয়ে। চূড়াটি মিশরের পিরামিডের মতো দেখতে। চূড়ার পাদদেশে চারটি করে দোচালা ও প্রত্যেক কোণে একটি করে চারচালা নির্মিত হয়েছে। এভাবেই চারটি দিকই নির্মিত। বাইরে থেকে ভেতরের দেওয়ালগুলি কতকগুলি খিলানের সমষ্টি। খিলানগুলির খাঁজে রয়েছে মুসলমানী স্থাপত্যের অনুসরণ। বাইরের খিলানের গায়ে পোড়ামাটির পদ্ম ও পূর্বের দেওয়ালে গায়ক-বাদকদের ছবি দেওয়া পোড়ামাটির প্যানেল রয়েছে। প্রতিটি দেওয়ালে খিলানের সংখ্যা সমান নয়। গর্ভগৃহ ও তার দক্ষিণ দিকের ছোট ঘর ঘিরে প্রথম স্তরে প্রতি দিকে পাঁচটি খিলান, দ্বিতীয় বা মাঝের স্তরে আটটি এবং তৃতীয় তথা বাইরের দিকে দশটি করে খিলান রয়েছে। বলা বাহুল্য এটি স্থাপত্যের প্রতি দিকে। এক কথায়, গর্ভগৃহটি দেওয়াল-দ্বারা ঘেরা নয়। রাসমঞ্চের গর্ভগৃহ ও পাশের কক্ষটিকে ঘিরে রয়েছে তিন প্রস্থ খিলানযুক্ত দেওয়াল যার প্রথম সারিতে মোট কুড়ি, দ্বিতীয় সারিতে মোট বত্রিশ, বাইরের সারিতে খিলানের সংখ্যা চল্লিশ।
রাস উৎসবের সময় মল্ল রাজবংশের পূজিত রাধাকৃষ্ণ মূর্তিগুলি রাসমঞ্চে নিয়ে আসা হত। জানা যায়, ১৯৩২ সাল পর্যন্ত রাসমঞ্চে মহাসমারোহে রাস উৎসব হয়ে এসেছে।
রাসমঞ্চ এক অভিনব স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। এমন স্থাপত্য শুধু বাংলাতেই নয়, সারা ভারতেও বিরল। আগেই বলেছি, এক সময়ে এই রাস পূর্ণিমার রাতে রাসমঞ্চ জুড়ে রাস উৎসব হত। এলাকার নামও রাসতলা। কিন্তু আজ আর সেই রাজ নেই, নেই সেই রাস উৎসব। যদিও বিষ্ণুপুর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রাধাকৃষ্ণের মন্দির। তবে এখন অধিকাংশ মন্দিরে নিরাপত্তার কারণে বিগ্রহ রাখা হয় না। তবে আলাদা আলাদা রাস হয় কৃষ্ণগঞ্জ আটপাড়া ষোলোআনা কমিটির রাধাল জিতু, মাধবগঞ্জ এগারো পাড়া ষোলোআনা কমিটির রাধামদনগোপাল জিতু ও বাহাদুরগঞ্জ চৌধুরীদের পারিবারিক বিগ্রহের। বিষ্ণুপুরের জাঁকজমক ভাবে রাস উৎসবের কথা বললে বিষ্ণুপুরের এই দুই গঞ্জের (কৃষ্ণগঞ্জ ও মাধবগঞ্জ) রাস উৎসবই বোঝায়। আর বিষ্ণুপুর শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে রাসতলায় মল্লরাজ বীর হাম্বীর প্রতিষ্ঠিত মাকড়া পাথরের ঐতিহাসিক তথা বিখ্যাত রাসমঞ্চটি বর্তমানে শুধু পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন