পরামর্শে রুবি জেনারেল হাসপাতালের জেনারেল ফিজিশিয়ান ডাঃ তীর্থপ্রতিম পুরকাইত।
সি-ফুড নিয়ে এখন সারা বিশ্বেই তোলপাড়
চলছে। পৃথিবীর সেরা রেস্তোরাঁগুলির মধ্যে এখন নিজেদের সুস্বাদু সি ফুড
পরিবেশন নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা।
সি-ফুড বলতে বাঙালিদের মধ্যে শুধুই
চিংড়ি, লটে, তোপসে ফ্রাই-এর বাইরে কিছু বুঝত না ঠিকই। তবে জাপান, চীনের
সামুদ্রিক খাদ্যের প্রতি প্রীতি ইউরোপ-আমেরিকায় বিখ্যাত হতেই ভারতেও লেগেছে
তার পরশ! ইতিমধ্যেই ভারতীয়দের পাতে উঠছে স্কুইড, অক্টোপাসের মতো সামুদ্রিক
খাদ্য। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সামুদ্রিক শৈবালও রেলিশ করে খাচ্ছেন মানুষ।
প্রশ্ন হল কেন খাবেন সামুদ্রিক খাদ্য?
• ফ্যাটি অ্যাসিডে পূর্ণ:
সামুদ্রিক মাছে থাকে উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড যা হার্ট এবং ব্রেনের স্বাস্থ্য
ভালো রাখে। নিয়মিত পাতে সামুদ্রিক মাছ রাখলে তা হার্টের রোগের ঝুঁকি কমায়
বলে বেশ কিছু সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে।
• উচ্চ গুণমানের প্রোটিন: কোষ এবং কলার ক্ষতপূরণে প্রয়োজন হয় সঠিক মাত্রার প্রোটিনের যা খুব সহজেই সামুদ্রিক খাদ্য থেকে পাওয়া যায়।
• স্বল্প মাত্রার স্যাচুরেটেড ফ্যাট: রেড মিটের তুলনায়, কিছু ধরনের সামুদ্রিক খাদ্যে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা অনেক কম থাকে।
•
ভিটামিন ও খনিজ: সামুদ্রিক মাছ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক খাবারে উপযুক্ত
মাত্রায় থাকে ভিটামিন ডি, বি কমপ্লেক্স ভিটামিন। এছাড়া থাকে আয়োডিন,
সেলেনিয়াম, এবং জিঙ্ক-এর মতো খনিজ।
• ব্রেন ফাংশন: ডিএইচএ-এর মতো ওমেগা
থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ব্রেনের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি এক
উপাদান। সামুদ্রিক মাছে যা থাকে উপযুক্ত মাত্রায়।
• মেজাজ ভালো রাখে:
বেশ কিছু সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি কমাতে সাহায্য করে
ওমেগা থ্রি। ফলে সামুদ্রিক খাদ্য ইতিবাচক থাকতেও সাহায্য করে।
• চোখের
স্বাস্থ্য: মাছের তেলে থাকে ডিএইচ নামে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যা বয়স
জনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন প্রতিরোধ করে চোখ ভালো রাখে।
• স্বাস্থ্যবান ত্বক: সামুদ্রিক মাছে থাকা নানা খনিজ ও ভিটামিন ত্বকের টানটান ভাব বজায় রাখতে সহায়তা জোগায়।
•
ওজন নিয়ন্ত্রণ: সি ফুড পুষ্টিগুণে ভরপুর হলেও ক্যালোরির মাত্রা কম। ফলে
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সামুদ্রিক খাদ্য খুবই ভালো একটি নির্বাচন হতে পারে।
জনপ্রিয় কিছু সি-ফুড
চিংড়ি: সুস্বাদু চিংড়ি নানাভাবে খাদ্যে ব্যবহার করা হয়। ভেজে যেমন এমনিই খাওয়া যায় তেমনই, পাস্তা, নুডলসে দিয়েও খাওয়া যায় চিংড়ি।
কাঁকড়া: কাঁকড়ার মাংসল অংশটিও স্বাদে মিষ্টি। সেদ্ধ এবং স্যুপ হিসেবে খাওয়া যায়।
লবস্টার: গ্রিলড বা বয়েলড লবস্টারের স্বাদ অনেকটা মাখনের মতো।
কড: সাদা রঙের মাছটির অনেক উপকার। ক্যালশিয়াম আছে সঙ্গে আছে ভিটামিন ডি তৈরির উপাদান।
ঝিনুক: স্যুপ বা সেদ্ধ করে খাওয়া যায় ঝিনুক।
স্ক্যালপ বা একধরনের শেল ফিশ: মিষ্টি স্বাদের এই শেল ফিশের রয়েছে অনেক গুণ।
অক্টোপাস
এবং স্কুইড: ভূমধ্যসাগরীয় নানা দেশ যেমন স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, এবং
জাপান, চীনের মতো এশিয়ার নানা দেশে অক্টোপাস এবং স্কুইডের ক্যুইজিন
জনপ্রিয়।
সামুদ্রিক খাদ্য খাওয়ার ঝুঁকি
সামুদ্রিক খাদ্যের যেমন স্বাস্থ্যকর দিক রয়েছে তেমনই রয়েছে কিছু স্বাস্থ্য ঝুঁকি।
পারদের
সংক্রমণ: হাঙর, সোর্ডফিশ, ম্যাকারেল এবং কিছু ধরনের টুনায় উচ্চ মাত্রার
পারদ থাকে যা সন্তানসম্ভবা মহিলা এবং শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য অপকারী।
সামুদ্রিক খাদ্য নিয়ে সতর্কবার্তা নিয়ে বলা যেতে পারে যে, সন্তানসম্ভবা
অবস্থায় সামুদ্রিক খাদ্য এড়িয়েও চলতে পারেন বা প্রেগনেন্সি চলাকালীন সময়ে
প্রথমবারের জন্য সি ফুড খাওয়া এড়িয়ে চলুন।
অ্যালার্জি: ঝিনুক, কাঁকড়া,
লবস্টারের মতো খাদ্য খাওয়ার পর অ্যালার্জি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে
অনেকের। এর ফলে ত্বকে র্যাশ বেরনো এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা যায়
শরীরে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে দ্রুত অবস্থার অবনতি ঘটে এনাফাইল্যাক্সিস শক-এ
চলে যেতে পারেন রোগী। ঘটতে পারে প্রাণহানি। তাই সামান্য সমস্যা দেখা দিলেও
সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সকের পরামর্শ নিন।
এছাড়া আধসেদ্ধ বা আধ ভাজা
সামুদ্রিক খাদ্য থেকে বিষক্রিয়াও হতে পারে কারণ এই ধরনের সামুদ্রিক খাদ্যে
থাকতে পারে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং প্যারাসাইট (উদাহরণ হিসেবে ভিব্রিও
কলেরি, সালমোনেল্লা, ফিতাকৃমির কথা বলা যায়।)। অসুখ হিসেবে স্কম্ব্রয়েড
বিষক্রিয়া, সিগুয়েটেরার বিষক্রিয়ার কথা বলা যায়। এছাড়া প্যারলাইটিক শেল
ফিশ পয়েজনিং, আনাসাকিয়াসিস, নোরোভাইরাস সংক্রমণ, হেপাটাইটিস এ রোগের কথা
বলা যায়।
খাদ্যে দূষণ উপাদান: কিছু ধরনের সামুদ্রিক খাদ্য
পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল, ডাইঅক্সিন, মাইক্রোপ্লাস্টিক দ্বারা দূষিত থাকে
যা খাদ্যগুলির মাধ্যমে মানব শরীরে প্রবেশ করে ও অঙ্গগুলির ক্ষতি করতে থাকে।
বেশি
খাওয়ার বিপদ: কিছু কিছু সামুদ্রিক মাছ বেশি মাত্রায় খাওয়া হচ্ছে। এর ফলে
পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রে দেখা দিচ্ছে গোলযোগ।
সঠিক সংরক্ষণের অভাব: সামুদ্রিক মাছ সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা হলেও তা খেলে দেখা দিতে পারে বিপদ।
কোলেস্টেরল:
বেশ কিছু সামুদ্রিক খাদ্যে কোলেস্টেরলের মাত্রা খুবই বেশি তাকে। ফলে
যাঁদের হার্টের অসুখ রয়েছে তাদের পক্ষে সি ফুড খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার আগে সতর্কতা
• সামুদ্রিক খাদ্য সবসময় টাটকা হওয়া দরকার। তাই কোনও দুর্গন্ধ পেলে কখনওই ওই মাছ কিনবেন না।
• মাছের চোখের দিকে খেয়াল করুন। ঘোলাটে এবং কোটরে ঢুকে গিয়েছে এমন মাছ কিনবেন না।
• মাছের কানকো উজ্জ্বল লাল অথবা গোলাপি হওয়া দরকার। বাদামি বা ধূসর হলে মাছ কিনবেন না।
• মাছের গায়ে আঙুল দিয়ে টিপে দেখুন, শক্ত এবং চাপ দেওয়ার পর চুপসে যাওয়া অংশ ফের আগের অবস্থানে ফিরে আসছে কি না দেখা দরকার।
• আঁশ চকচকে এবং শক্তভাবে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে আছে কি না দেখুন।
•
শেল ফিশ (ঝিনুক, অয়েস্টার) এর মতো সি ফুড-এর খোলক একে অপরের সঙ্গে শক্তাবে
জুড়ে আছে কি না দেখুন। খোলক খোলা অবস্থায় থাকলে ও চাপ দিয়ে বন্ধ করার
পরেও না জুড়লে খাবেন না।
• যেখান সেখান থেকে সি ফুড কিনবেন না।
• চেনা বাজার, রেস্তোরাঁর খাবার কিনুন।
•
সামুদ্রিক খাদ্য ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখুন। তবে সামুদ্রিক খাদ্য হিমায়িত
অবস্থায় থাকলে প্রথমে খাদ্যবস্তু স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনুন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন