সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে যেন মিয়াজাকির স্টুডিও জিবলির আয়নাতে, গল্পের চরিত্রদের মতোন হয়ে। সকলেই যেন হঠাৎই জিবলি দুনিয়ার বাসিন্দা হয়ে উঠছেন। আচ্ছা কেমন হয়, যদি সত্যিই থাকে এমন এক জগত যেখানে পর্দায় দেখা চরিত্রদের মতন হেঁটে চলে বেরিয়ে আসা যাবে। এমন সুযোগ কিন্তু সত্যিই আছে খোদ জাপানে। নাগাকুতে সিটির আইছি প্রিফেকচারের এই থিম পার্কটি সারা বিশ্বের মানুষকে রোজ আহ্বান জানাচ্ছে জিবলির জগৎ ঘুরে যেতে।
স্টুডিও জিবলির অ্যানিমেশন শৈলী, পটু হাতের আঁকায় চিত্রায়ন ও সূক্ষ্ম বর্ণনাশৈলী – প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকেই এক অনন্য স্বাক্ষর হয়ে আছে। তাই জিবলি পার্ক জাপানের অনন্য সকল চমৎপ্রদ সৃষ্টির অন্যতম। নাগাকুতের এই থিম পার্কটি সেই জাদুর দেশের দরজা সর্বসাধারণের খুলেছিল ২০২২ এর ১লা নভেম্বরে। প্রবেশদ্বারে টিকেট কেটে ঢুকতেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে পর্দার স্পিরিটেড আওয়ে, মাই নেইবর তোতোরো, প্রিন্সেস মনোনোকে, হাউয়েলস মুভিং ক্যাসেল আরো কতো কি! এনিমেশনের আঁক কতোখানি জীবনস্পর্শী তারই যেন উদযাপন আইছি এক্সো মেমোরিয়াল পার্কের এক টুকরো বুক জুড়ে, যার ছত্রে ছত্রে সাজানো স্টুডিও জিবলির ছবিগুলো।
জিবলির জাদুকরী দুনিয়ার জীবন্ত প্রকাশক্ষেত্র এই ওয়ারহাউসটি। একখানি বিশাল ব্রিজ পেরিয়ে সবুজ দরজা ডিঙ্গিয়ে গিয়ে যেখানে দেখতে পাওয়া যাবে জিবলির বাসিন্দাদের বিশালাকার প্রতিকৃতি আর জেগে ওঠা গল্পগুলোর খন্ডচিত্র। স্পর্শ করে দেখা যাবে প্রতি গৃহকোণ, সেই রকম বসার ঘর, রান্না ঘর, শোবার ঘর। আবার গল্পের দৃশ্যের মতোন ডিরেক্টর রুমে বসা বুড়ি যুবাবা। এখানে দর্শকরা গল্পের চরিত্রদের মতন সেজে আলোকচিত্র তোলার সুযোগ উপভোগ করেন।মিনামি মাচি থেকে সংগ্রহ করা যাবে গল্পের বই। আছে বিপনী বিতান যেখান থেকে সংগ্রহ করা যাবে সুভিনিয়র। এর পাশেই বিশালাকার থিমের বাগান, চোখে যেন ধন্ধ লাগে- এ আমি কোথায়, এরেইটির রুমে? সংগ্রহ শালার দেয়াল জুড়ে আটা জিবলি মুভির ডিভিডি কেস। থিয়েটার ঘরের ভেতর দেখা যাবে সিনেমা। সাথে আছে এক ছোট্ট রেস্টুরেন্ট যেখানে পাওয়া যাবে গল্পের মতন আহার।
মনোনোকে ভিলেজ
রাজকুমারী মনোনোকের গ্রাম এটি। যেন চোখের সামনে জীবন্ত বিস্ময়। দানবাকৃতি নানান রকম প্রতিকৃতি।একদম হবহু বনানী। গাছের পরশ আর শীতল ছায়া। তার মাঝে খড়ের ছাওয়ায় কাঠের উঁচু বাড়িটি। গ্রামীণ পরিবেশে কাঠকয়লার ধোঁয়ায় নিজেই বানিয়ে ফেলা যাবে রাইস কেক।
হাওয়েলের চলমান ক্যাসেল
পার্কের সব থেকে মজার জায়গা হাওয়েলের ইচ্ছে মতন জায়গায় চলতে পারা ক্যাসেলটি। পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতির সিঁড়ি বেয়ে ভেতরটায় ঢুকলেই দেখতে পাওয়া যাবে গল্পের মতন পরিপাটিহীন গৃহস্থালি।
ক্যাটবাস
জিবলি পার্কে বেড়াতে আসলে বিড়াল বাসে চড়তে ভুলে গেলে চলবে না। ছোট্ট বাসটি যখন যাত্রা শুরু করবে মনে হবে যেন এনিমেশনের বেড়াল রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে চলছে।
ডনডোকো বন
এই বনে ঢুকলে প্রথমেই দুহাত তুলে স্বাগত জানাবে জনপ্রিয় চরিত্র তোতোরো। এখানেই তোতরো নাচে ডনডোকো নাচ। বিপনীতে পাওয়া যাবে নানান আকারের তোতোরো পুতুল।
আধুনিক অ্যানিমেশনের ডিজিটাল নির্ভরতার বিপরীতে জিবলির গতানুগতিক অ্যানিমেশন এতো প্রযুক্তির মাঝেও তাদের চলচ্চিত্রে এনে দেয় এক বিশেষ উষ্ণতা ও প্রাণবন্ততা। প্রতিটি দৃশ্য যেন নিখুঁতভাবে আঁকা এক টুকরো স্বপ্ন।
এই শিল্পসুষমা ও খুঁটিনাটির প্রতি ভালোবাসারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ‘জিবলি পার্ক’। নিঃসন্দেহে জিবলি ভক্তদের মনঃপূত স্থান। পার্কটির প্রতিটি কোণা যেন একেকটি জাদুকরী ক্যানভাস—যেখানে বাস্তব আর কল্পনার অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটে। পার্কটি শুধু জিবলির সিনেমাগুলোর চেনা রঙিন দৃশ্যপটকে জীবন্ত করে তোলে না, বরং তাদের মূল ভাবনা—প্রকৃতি রক্ষা, শিশুসুলভ কৌতূহল আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতি নস্টালজিয়া—এসবকেও গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়।
জিবলি পার্ক যেন এক নিরব গল্পকার, যে দর্শকদের চোখে চোখ রেখে বলে যায়—জগতটা এখনো সুন্দর, যদি আমরা দেখতে জানি। যেটা ছিল স্টুডিও জিবলির স্রষ্টা হাওয়াও মিয়াজাকির এই সুন্দর কাজগুলির মাধ্যমে দেয়া বার্তা।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন