কলকাতা: ফোয়ারাটি রেলিং এবং লোহার জাল দিয়ে ঘেরা। সাধারণ কোনও ফোয়ারা এটি নয়। কলকাতা পুরসভার হেরিটেজ বিভাগের তালিকা অনুযায়ী, বারাণসী ঘোষ স্ট্রিটে এই ফাউন্টেনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলায় মহাভারতের রচয়িতা কালীপ্রসন্ন সিংহ স্বয়ং। ফোয়ারাটি সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ, সংস্কারের নামে নষ্ট করা হয়েছে ঐতিহ্য। চারিদিক মুড়ে দেওয়া হয়েছে মার্বেলে। এখন রক্ষণাবেক্ষণও সেভাবে হয় না। একাধিক গাছের টব যত্রতত্র রাখা। নানা ধর্মীয় পতাকা লাগানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাাদের অভিযোগ, ঐতিহ্য নষ্ট হয়েছে ঐতিহাসিক ফোয়ারাটির। জায়গাটি দৃষ্টিকটূ হয়ে উঠেছে। দেখে বোঝারই উপায় নেই যে,এটি হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত।
পুরসভা সূত্রে খবর, ফোয়ারাটি কবে সংস্কার
হয়েছে কর্তৃপক্ষের জানা নেই। পুরসভার কোন বিভাগ সংস্কারের দায়িত্বে
ছিল,সে তথ্য বা সেই সংক্রান্ত কোনও ফাইল হেরিটেজ বিভাগের কাছে নেই।
সংস্কারের অনুমতি সংক্রান্ত তথ্যও মিলছে না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে,
হেরিটেজ বিভাগের অনুমতি ছাড়া কিভাবে এই ঐতিহাসিক স্থল সংস্কার হল? হেরিটেজ
বিভাগের মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দার বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
গিরিশ পার্ক থেকে গণেশ টকিজের রাস্তা ধরে
একটুএগলে বাঁদিকে একটি ত্রিকোণ পার্ক। সেই পার্কের গা বরাবর বারাণসী ঘোষ
স্ট্রিট। গলি ধরে একটু ভিতর দিকে হাঁটলে তিন রাস্তার সংযোগস্থল। সেখানেই
একটি মন্দির লাগোয়া জায়গায় রয়েছে ফোয়ারাটি।
পুরসভার ওয়েবসাইটে ২০২২
সালের আট আগস্টের সর্বশেষ হিসেবে যে হেরিটেজের তালিকা রয়েছে, তাতে
কালীপ্রসন্ন সিংহের তৈরি এই ফাউন্টেনটির সংস্কার হওয়ার কথা লেখা। কিন্তু
ফোয়ারাটি সামনে থেকে দেখলে কিছুই বোঝা যায় না। কোনও ঐতিহাসিক জায়গার সামনে
বোর্ড দিয়ে হেরিটেজ সম্পর্কিত উল্লেখ থাকে। কিন্তু কালীপ্রসন্নর ফোয়ারার
গায়ে তেমন কিছুই নেই। কালীপ্রসন্ন সিংহ কে? তিনি কেন বিখ্যাত? সেসব তথ্যও
নেই।
কালীপ্রসন্ন সিংহ উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ‘সিংহ’
পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নন্দলাল সিংহ। বর্তমানে প্রেসিডেন্সি
কলেজ, তত্কালীন হিন্দু কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন কালীপ্রসন্ন। ১৮৫৭ সালে কলেজ
ত্যাগ। বাড়িতেই ইংরেজি, বাংলা ও সংস্কৃত শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন।
কালীপ্রসন্ন লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক, লোকহিতৈষীএবং শিল্প-সাহিত্য ও
সংস্কৃতির মহান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে অবদান রেখে গিয়েছেন। চোদ্দ বছর বয়সে ১৮৫৩
সালেতিনি বাংলা ভাষা চর্চার জন্য ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
১৮৬২ সালে তাঁর লেখা‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ প্রকাশিত হয়। তিনি এই বইয়ে
হুতোম প্যাঁচা ছদ্মনামে ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তত্কালীন মধ্যবিত্ত সমাজের
সমালোচনা করেছিলেন। অনেকের মতে এটি কথ্য ভাষায় লেখা প্রথম বাংলা বই। ১৮৫৭
সালে, কালীপ্রসন্ন কালিদাসের সংস্কৃত রচনার উপর ভিত্তি করে ‘বিক্রমোর্বশী’
নাটক লেখেন। তবে তাঁর সবথেকে বড় কীর্তি, তাঁর সম্পাদনায় ১৮ পর্ব মহাভারত
গদ্য আকারে বাংলায় অনুবাদ। যা এখনও প্রকাশিত হয়। এই অনুবাদটি ১৮৫৮ থেকে
১৮৬৬ সালেরভিতর প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’রও অনুবাদ করেছিলেন। এটি তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন