
একটি সময় ছিল যখন সিনেমা কথা বলতে পারতো না। অর্থাৎ, শব্দহীন ও সংলাপহীন সিনেমা যেখানে শুধুমাত্র শিল্পীরা অভিনয়ের মাধ্যমে পুরো গল্পকে এগিয়ে নিতো। হলিউড ইন্ডাস্ট্রির এই নির্বাক যুগের স্থায়িত্ব ছিল ১৮৯০ থেকে ১৯৩০ এর দশক পর্যন্ত। প্রযুক্তির আদলে সিনেমা যখন কথা বলতে শেখে নির্বাক চলচ্চিত্রের নির্মাণে আসে বিরতি। ততোদিনে নির্মিত হয় কালজয়ী কিছু নির্বাক সিনেমা। তেমনি ১০টি সিনেমা নিয়েই এই লেখা।
দা ক্যাবিনেট অফ ড. ক্যালিগারি (১৯২০)
রবার্ট উইন পরিচালিত ‘দা ক্যাবিনেট অফ ড. ক্যালিগারি’ তৎকালীন জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট আন্দোলনের বা বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদ সর্বপ্রথম হরর/ফ্যান্টাসি ঘরানার সিনেমা।
এক গ্রামীণ মেলায় ফ্রান্সিস ও তার বন্ধু অ্যালান এর রহস্যময় ড. ক্যালিগারির সাথে পরিচয় হয়। ক্যালিগারি সোমনমবুলিস্ট (যে ঘুমের ঘোরে হেঁটে বেড়ায়) সিজারকে দিয়ে শহরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটাতে থাকে। ফ্রান্সিস রহস্য উন্মোচনের প্রক্রিয়ায় নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন হয়। গল্প শেষ পর্যায়ে ব্যতিক্রমী মোড় নেয়। কে সেই হত্যাকারী? জানতে সিনেমাটি দেখে ফেলুন।
নসফেরাতু: আ সিম্ফনি অফ হরর (১৯২২)
ক্লাসিক ভ্যাম্পায়ার সিনেমার কথা বললে সিনেমাপ্রেমীদের মাথায় সর্বপ্রথম নাম আসে এফ ডব্লিউ মুরনাউ পরিচালিত ‘নসফেরাতু’র। ব্র্যাম স্টোকারের "ড্রাকুলা"(১৮৯৭) উপন্যাসের অননুমোদিত অভিযোজন হওয়াতে কপিরাইট মামলাও পোহাতে হয়েছে সিনেমাটির।
জার্মানির উইসবর্গ নামের কাল্পনিক শহরে রিয়াল এস্টেট এজেন্ট হুটার ভ্রমণ করেন রহস্যময় কাউন্ট অরলোকের নিকট বাড়ি বিক্রির উদ্দেশ্যে। অরলোকের অদ্ভুত সকল আচরণের এক পর্যায়ে হুটার বুঝতে পারে সে কোনো সাধারণ মানুষ নয় বরং একজন ভ্যাম্পায়ার।
ব্যাটেলশীপ পটেমকিন (১৯২৫)
‘ব্যাটেলশীপ পটেমকিন’ সার্গেই আইনস্টাইন পরিচালিত বিখ্যাত সোভিয়েত সিনেমাটি ১৯০৫ সালে রাশিয়ান যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিনে সংঘটিত বিদ্রোহের নাটকীয় বর্ণনা।
একদল নাবিক তাদের দুর্গন্ধযুক্ত মাংস খাওয়ানোসহ বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভাকুলিনচুকের নেতৃত্বে অত্যাচারী অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। এর মাঝে ভাকুলিনচুকের মৃত্যু হলে, ওডেসা শহরের জনগণের মাঝে বৃহত্তর বিপ্লবের সূচনা হয়।
মেট্রোপোলিস (১৯২৭)
ফ্রিটজ ল্যাং পরিচালিত সাই-ফাই ঘরানার 'মেট্রোপোলিস' একটি জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট সিনেমা, ভবিষ্যতের ডাইস্টোপিয়ান কল্পনায় নির্মিত।
২০০০ সালের একটি শহর, যেখানে আকাশচুম্বী অট্টালিকায় ধনী অভিজাত শ্রেণী এবং শহরের নিম্নস্থলে নিপীড়িত শ্রমিক শ্রেণী বসবাস করে।
ধনী শাসকের পুত্র ‘ফ্রেডার’ নিম্নশ্রেণির বিপ্লবীচেতনাধারী মারিয়ার সাথে মিলে এই শ্রেণি বিভাজন শেষ করার সংকল্প করে। গল্পের মোড় ঘুড়ে যায় যখন পাগল বিজ্ঞানী ‘রোটওয়াং’ সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে মারিয়ার অবিকল একটি রোবট তৈরি করে ফেলে। কি বাস্তবের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে কি?
দা কিড (১৯২১)
পরিচালক, লেখক, প্রযোজক হিসেবে চার্লি চ্যাপলিনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দা কিড’।
সিনেমায় চ্যাপলিনকে তার বিখ্যাত ভবঘুরে বা ‘ট্র্যাম্প’ চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়।
একদিন রাস্তার পরিত্যক্ত গলিতে তিনি একটি শিশুকে খুঁজে পায় এবং নিজ সন্তানের মতো লালন-পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পিতা-পুত্রের ভালোবাসার বন্ধন, দারিদ্র্য, দুষ্টুমি ও জীবন সংগ্রামের গল্প বলে এ সিনেমা।
সিটি লাইটস (১৯৩১)
টকিজ এর যুগে চার্লি চ্যাপলিন ইচ্ছে করে নির্বাক রেখেছেন রোমান্টিক-কমেডি ঘরানার ‘সিটি লাইটস’ সিনেমা।
এক ভবঘুরে একটি অন্ধ ফুল বিক্রেতা মেয়ের প্রেমে পড়ে। মেয়েটি ছেলেটিকে ভুলবশত একজন ধনী ব্যক্তি বলে মনে করে। মেয়েটির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার চিকিৎসার জন্য তিনি অর্থ যোগানের নানা দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা চালায়।
দা লোজার: আ স্টোরি অফ দা লন্ডন ফগ (১৯২৭)
থ্রিলার ও ক্রাইম ঘরানা খ্যাত পরিচালক আলফ্রেড হিচককের সর্বপ্রথম থ্রিলার সিনেমা ‘দা লোজার’। এটি মেরি বেলোক লোনডেসের উপন্যাস ‘দা লোজার: অ্যা স্টোরি অফ দা লন্ডন ফগ’ (১৯১৩) অবলম্বনে নির্মিত।
‘দ্য অ্যাভেঞ্জার’ নামের এক সিরিয়াল কিলার লন্ডন শহরে অল্পবয়সী স্বর্ণকেশী (ব্লন্ড) নারীদের খুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
সেসময় একজন রহস্যময় ব্যক্তি বান্টিং দম্পতির বাসা ভাড়া নেয়, যার অদ্ভুত সব আচরণ ও কার্যকলাপ সন্দেহ বয়ে আনে। গল্পের ক্লাইম্যাক্সে রয়েছে হিচককের সিগনেচার টুইস্ট যার জন্য তিনি এত জনপ্রিয়।
দা প্যাশন অফ জোয়ান অফ আর্ক (১৯২৮)
কার্ল থিওডর ড্রেয়ার পরিচালিত ফরাসি চলচ্চিত্র ‘দা প্যাশন অফ জোয়ান অফ আর্ক’ পঞ্চদশ শতাব্দীর এক কৃষক পরিবারের মেয়ে জোয়ান অফ আর্কের জীবনের শেষ দিনগুলোর একটি সত্য সংক্ষিপ্ত গল্প বড় পর্দায় দেখায়।
১৯ বছর বয়সী জোয়ান বিশ্বাস করতেন ‘হান্ড্রেড ইয়ার্স ওয়ার’ (১৩৩৭- ১৪৫৩) এ ঈশ্বর ফ্রান্সকে বিজয়ের দিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাকে বেছে নিয়েছিলেন। সিনেমায় ট্রায়ালের জিজ্ঞাসাবাদ, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার, নৃশংস মৃত্যুদণ্ড দেখানো হয়।
দা জেনারেল (১৯২৬)
বাস্টার কিটন অভিনীত ও পরিচালিত 'দা জেনারেল' আমেরিকান গৃহযুদ্ধকালীন সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত একটি সিনেমা, যা উইলিয়াম পিটেনগারের স্মৃতিকথা ‘দ্য গ্রেট লোকোমোটিভ চেজ’(১৮৮৯) হতে গৃহীত।
রেলওয়ে প্রকৌশলী জনি গ্রের জীবন লোকোমোটিভ (ট্রেন) এবং তার প্রেমিকাকে ঘিরে। যখন ইউনিয়ন গুপ্তচররা তার ট্রেন চুরি করে জনি উদ্ধারের এক সাহসী অ্যাডভেঞ্চারের যাত্রায় বেড়িয়ে পড়ে।
সানরাইজ: আ সং অফ টু হিউম্যানস (১৯২৭)
কিংবদন্তি এফ ডব্লিউ মুরনাউ পরিচালিত ‘সানরাইজ: আ সং অফ টু হিউম্যানস’ মুক্তির পর তেমন সফলতা না পেলেও পরবর্তীতে অস্কারসহ নানা পুরস্কার অর্জন করেছে।
রোমান্স ও ড্রামার মিশেল তৈরি এ
গল্পে একজন গ্রামীণ কৃষক শহুরে এক মহিলার সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে
পড়ে, যে তার স্ত্রীকে হত্যার জন্য প্ররোচিত করে। কৃষকটি পরিকল্পনা করলেও
শেষ পর্যন্ত তা আর করে উঠতে পারে না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন