নয়াদিল্লি: ‘বন্ধু’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দৌত্য সত্ত্বেও ভারতীয় পণ্যের উপর ২৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক চাপিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বুধবার গভীর রাতে হোয়াই হাউসের রোজ গার্ডেনে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণায় ভারতের উপর কতটা প্রভাব পড়বে? রপ্তানির ক্ষেত্রে কোন কোন পণ্যে কতটা ধাক্কা লাগতে পারে? বৃহস্পতিবার কেন্দ্রের এক প্রবীণ কর্তা বলেন, ‘ট্রাম্প ট্যারিফ’-এর প্রভাব খতিয়ে দেখছে বাণিজ্য মন্ত্রক। কোনও দেশ যদি আমেরিকার উদ্বেগের বিষয়গুলি সমাধানের রাস্তায় হাঁটে, তাহলে সেই দেশের পণ্যে শুল্কের পরিমাণ কমানোর কথা ভাবা যেতে পারে বলে জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইতিমধ্যেই আমেরিকার সঙ্গে ভারতের একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে চুক্তির প্রথম অংশ চূড়ান্ত হয়ে যেতে পারে। ফলে ধাক্কা নয়, বরং ভারতের উপর মিশ্র প্রভাব পড়তে পারে। রপ্তানিকারীদের সর্বোচ্চ সংগঠন এফআইইও বলেছে, দেশীয় সংস্থাগুলি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে ঠিক কথা। তবে প্রতিযোগী দেশগুলির তুলনায় ভারত অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে।
কেন্দ্রের ওই প্রবীণ আধিকারিক জানিয়েছেন, ভারতীয় পণ্যের উপর ইউনিভার্সাল ১০ শতাংশ ট্যারিফ বসছে ৫ এপ্রিল থেকে। ১০ এপ্রিল থেকে চাপবে বাকি ১৭ শতাংশ। বাণিজ্য মন্ত্রকের তরফে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শিল্প ক্ষেত্রের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞ সহ সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। আমেরিকার চাপানো শুল্কের কেমন প্রভাব তৈরি হচ্ছে, সেসম্পর্কে তাঁদের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হবে। এছাড়া, এদিন উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও। প্রধানমন্ত্রী মোদি থাইল্যান্ড সফরে থাকায় বৈঠকের নেতৃত্ব দেন তাঁর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রক, নীতি আয়োগ, টিপিআইআইটি সহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্তারা।
আমেরিকার এই পদক্ষেপে ‘বড় ধাক্কা’র আশঙ্কা করছেন রত্ন ও গয়না রপ্তানিকারীরা। এই ক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থরক্ষায় সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের আর্জি জানিয়েছেন তাঁরা। কমলা জুয়েলারির এমডি কলিন শাহ বলেন, ‘ভারতের জন্য বড় ধাক্কা। বর্তমানে খুচরো হীরেতে শূন্য শতাংশ ও সোনার গয়নায় ৫.৫ থেকে ৭ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। সেটাই বেড়ে ২০ শতাংশ হতে পারে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে রত্ন ও গয়না ক্ষেত্র।’ উল্লেখ্য, ভারতের গয়না রপ্তানির অন্যতম বড় বাজার হল আমেরিকা। মোট রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ গয়নাই মার্কিন মুলুকে যায়। এই রপ্তানির আর্থিক পরিমাণ বছরে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার।
প্রমাদ গুনছে ইস্পাত শিল্পও। আমেরিকা শুল্ক চাপানোয় বিভিন্ন দেশে ভারত যে পরিমাণে ইস্পাত রপ্তানি করে, তা কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা। অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল ডিভাইস ইন্ডাস্ট্রি (এআইমেড) বলেছে, অতিরিক্ত শুল্কের ফলে রপ্তানি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বৃদ্ধির পথে তা অন্তরায় হয়ে উঠবে।
২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত আমেরিকাই ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক সহযোগী। ভারতের মোট রপ্তানির ১৮ শতাংশই যায় আমেরিকায়। মোট আমদানির ৬.২২ শতাংশ আসে আমেরিকা থেকে। ২০২৪ সালে ভারত থেকে আমেরিকায় ৮১০ কোটি ডলারের ওষুধ ফর্মুলেশন ও বায়েলিজিক্যাল পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৬৫০ কোটি ডলারের টেলিকম যন্ত্রপাতি, ৫৩০ কোটি ডলারের দামি ও মাঝারি মূল্যের রত্ন, ৩২০ কোটি ডলারের সোনা ও অন্য মূল্যবান ধাতুর গয়না, ২৭০ কোটি ডলারের লৌহ ও ইস্পাত, ২৮০ কোটি ডলারের সুতির রেডিমেড পোশাক রপ্তানি হয়েছে। আমেরিকা বড় পরিমাণে পাল্টা শুল্ক আরোপ করায় এই সমস্ত ক্ষেত্রেই ধাক্কার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন