ধূপগুড়ি: রাশিয়া আর ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধের কিছু খবর পেতেন, কিছু পেতেন না। একদিন হঠাৎ জানতে পারলেন রাশিয়ার সৈন্যরা দখল করে নিয়েছে খারকিভ শহর। প্রাণ বাঁচাতে ঠাঁই বাঙ্কারে। বাইরে গোলাগুলির বিকট শব্দ। বাতাসে বারুদের গন্ধ বাঙ্কারের ফাঁকফোকর গলে নাকে আসে। দেওয়াল ফুঁড়ে ঢোকে মিসাইলের প্রাণঘাতী আওয়াজ। বাঙ্কারে ঘনঘন বাজে সাইরেন। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা ছাড়া তখন আর কিছুই করার ছিল না ভারত থেকে ডাক্তারি পড়তে যাওয়া আশিস বিশ্বাসদের। একদিন খাবার শেষ। জলও প্রায় শেষ। এল ইউক্রেনের কয়েকজন সেনা অফিসার। বাঙ্কার থেকে বের করল সবাইকে। তারপর দীর্ঘ ন’ঘণ্টা কনকনে ঠান্ডা বরফের উপর দিয়ে হেঁটে খারকিভ স্টেশন। সেখান থেকে পোল্যান্ড। তারপর ভারতীয় দূতাবাসের সাহায্যে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরলেন আশিস। ভালো পড়াশোনা করেও মিলল না ডাক্তারির ডিগ্রি। মন খারাপ। কিন্তু হাল ছাড়লেন না মেধাবী ছাত্রটি।
ভারত থেকে প্রায় সাড়ে ছ’হাজার কিমি দূরে ইউক্রেনে ডাক্তারি পড়তে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতা হবে দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি ধূপগুড়ির গাদং-এক নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের কাজিপাড়ার বাসিন্দা আশিস। তিনি ইউক্রেনের ভিএন কারাজিন খারকিভ ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। খারকিভ শহরের ঠিক পাশেই আবার রাশিয়া-ইউক্রেন বর্ডার। ভারতে আশিসের বাবার মুদির দোকান। টানাটানির সংসার সত্ত্বেও ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। মা-বাবার আশা, ছেলে বড় ডাক্তার হবে। দেশে ফিরে মানুষের সেবা করবে। কিন্তু আশিস ইউক্রেনে পৌঁছনোর কয়েক বছরের মাথায় যুদ্ধ শুরু। শুরু প্রাণ হাতে বেঁচে থাকার লড়াই। পড়াশোনা তখন প্রায় বিলাসিতা। বাধ্য হয়ে ফিরলেন ধূপগুড়ি। মার্চ থেকে টানা বাড়িতেই থাকলেন একবছর। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের তীব্রতা খানিকটা যখন কমল তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বার্তা, কোর্স শেষ করতে চাইলে ইউক্রেনে আসতে পারেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভূঁইয়ে আর ছেলেকে যেতে দিতে চাইলেন না মা রেখাদেবী ও বাবা বাবন বিশ্বাস। তবে প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে। এ দেশে বিশেষ কোনও ব্যবস্থাও হয়নি। তাই মা-বাবাকে বুঝিয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রাণ হাতে নিয়ে ফের ইউক্রেন রওনা দিলেন আশিস। জানা গিয়েছে, প্রথম পর্যায় বাংলা থেকে বহু পড়ুয়া ইউক্রেনে গেলেও দ্বিতীয়বার যান মাত্র তিনজন। সেই তালিকায় আশিসের নাম। তাঁর মুখ থেকে শোনা গেল, ‘রাখা হল বাঙ্কারে। মাঝেমধ্যেই মিসাইল পড়ছে। তখন ভূমিকম্পের মতো কাঁপত বাঙ্কার। কলেজে ক্লাস চলাকালীন সাইরেন বেজে উঠত যখন তখন। তখন ক্লাস ছেড়ে ফের বাঙ্কারে। একদিন কলেজেও পড়ল মিসাইল। তবে কারও কোনও ক্ষতি হয়নি। এভাবে চলতে চলতেই ২০২৫’য়ের জানুয়ারিতে এল বহু প্রতীক্ষিত ডিগ্রি। জেদ ছিল খুব, তাই ফের ইউক্রেনে যাওয়া এবং ডাক্তারি ডিগ্রি নিয়ে তবে বাড়ি ফেরা।’

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন