কাটোয়া: আউশগ্রামে পর্যটকরা এলে একবার অন্তত ঢুঁ মারেন দরিয়াপুর গ্রামে। ডোকরা শিল্প সৃষ্টির জন্য খ্যাতি গ্রামটির। আর সেই খ্যাতিকে যে কয়েকজন শিল্পী বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন তাঁদের একজন রামু কর্মকার। রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত শিল্পী। পর্যটকরা তাঁর বাড়িতেও আসেন। সেলফি তোলেন। তাঁর সৃষ্টিকর্মের ছবিও তোলেন। এখন আর এসব দেখলে খুব একটা ভালো লাগে না রামুবাবুর। সেলফি, ছবিতে তো আর পেট ভরবে না! ওষুধ কেনার টাকা মিলবে না! ঘুঁচবে না রামু কর্মকারের দুর্দশাও!
সত্যিই বড্ড দুর্দাশায় রয়েছেন রাষ্ট্রপতি সম্মান পাওয়া এই
শিল্পী। কোভিড মহামারী কেড়ে নিয়েছে তাঁর জীবনের সৃষ্টি সুখ। ডোকরা নিয়ে
তেমন আর কাঁটাছেঁড়া করেন না। রামুবাবুর হাতে আর তৈরি হয় না ডোকরার
নিত্যনতুন শিল্প। গ্রামের ভিতর ছোট্ট একটা গুমটি খুলেছেন। লজেন্স, চিপস,
চানাচুর বিক্রি করেন। তাতেই কোনও রকমে পেট চলে। বয়স এখন আটান্ন। একাধিক
রোগ বাঁসা বেঁধেছে শরীরে। নিয়মিত প্রচুর ওষুধ খেতে হয়। পেটের খরচ বাঁচিয়ে
ওষুধ কেনার টাকা পান না তিনি। রাতে রাষ্ট্রপতির দেওয়া সম্মান-স্মারকের দিকে
হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েন রামুবাবু। সকাল হলেই গুমটিতে গিয়ে
বসেন তিনি। কথায় কথায় বুধবার বলছিলেন, ‘আর পেরে উঠছি না। ওষুধ কেনার টাকা
জোগাড় করতে হিমশম অবস্থা। প্রচুর দাম বেড়ে গিয়েছে। সরকার যদি কোনও ভাবে
শিল্পভাতার ব্যবস্থা করত তা হলে খানিক উপকার হতো। প্রশাসনে বহু দরবার
করেছি। লাভের লাভ কিছুই হয়নি।’ বর্ধমান সদর উত্তরের মহকুমা শাসক তীর্থঙ্কর
বিশ্বাসের আশ্বাস, ‘ডোকরা শিল্পীদের জন্য নানা কাজকর্ম হয়েছে। রামুবাবু
কেন এখনও সাহায্য পাননি, তা খতিয়ে দেখব।’
পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রাম-১
ব্লকের দিগনগর-২ পঞ্চায়েতের দরিয়াপুর গ্রামের ডোকরা ঐতিহ্যের অন্যতম
ভাগীদার রামু কর্মকার। ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পান। ডোকরা শিল্পকর্ম
নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত সহ বাংলাদেশে গিয়েও প্রশিক্ষণ দিয়ে এসেছেন।
বাড়িতে ঠাসা তাঁর নানা শিল্পকর্মের ছবি। সে সব আজ অতীত। ছোট্ট গুমটি
বর্তমান। ‘করোনার পর আমার জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। তখনই এই গুমটি খুলে
বসি। ডোকরা শিল্পের এখনও চাহিদা থাকলেও লাভ হয় না। মধ্যসত্ত্বভোগীরা ঢুকে
পড়েছে। তাঁরাই গুড় খাচ্ছে। শিল্পীদের দিন গুজরান করা অসম্ভব হয়ে
উঠছে।’—গলায় আক্ষেপের সুর রামুবাবুর।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন