বিধাননগর: ‘মাকে খুন করে এসেছি! রাতে খাওয়া হয়নি! কিছু খাবার আছে?’ শুক্রবার সকাল! অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে তখন গরম চা ফুটছে। এমন অদ্ভূত স্বীকারোক্তি শুনে চমকে উঠলেন চায়ের দোকানদার। দেখলেন, নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ৩৩ বছরের এক যুবক! পরণে হাফপ্যান্ট ও তুঁতে রঙের টি-শার্ট। তার হাত-পা কাঁপছে। নড়ছে ঠোঁট। দু’হাতের আঙুল গুটিয়ে ফেলছে। আবার সোজা করছে! অস্বাভাবিক আচরণ দেখে সন্দেহ হয় দোকানদারের। তিনি সঙ্গে সঙ্গে খবর দেন আবাসনের নিরাপত্তারক্ষীদের! সবাই মিলে সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটের দরজা ঠেলা দিতেই খুলে যায়। গোটা মেঝে রক্তে ভাসছে। চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছেন এক মহিলা। বৈদিক ভিলেজের অভিজাত আবাসনে এহেন হাড়হিম করা হত্যাকাণ্ডে শিউরে উঠছেন আবাসিকরা। মাকে নৃশংসভাবে খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে ছেলে। পুলিস জানিয়েছে, মৃতা মায়ের নাম দেবযানী মজুমদার (৫৮)। ধৃত ছেলের নাম সৌমিক মজুমদার। অবসাদ, আর্থিক সমস্যা নাকি অন্যকিছু? খুনের কারণ নিয়ে শুরু হয়েছে তদন্ত।
পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজারহাটের বৈদিক ভিলেজের ভিতরে রয়েছে একটি অভিজাত আবাসন। ২০২১ সাল নাগাদ সৌমিকের বাবা সৌমেন্দ্রবাবু সেখানে একটি এক কামরার ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। আগে তাঁরা সন্তোষপুরে থাকতেন। সেখানে বাবা- মাকে নিয়ে থাকত সৌমিক। বছর তিনেক আগে বাবার মৃত্যুর পর মা-ছেলে থাকতেন। সৌমিকের বয়স মাত্র ৩৩। সে বিপিও’তে কাজ করত। বছরখানেক আগে তার চাকরি চলে যায়। তারপর থেকে সে মানসিক অবসাদগ্রস্ত। মায়ের কাছে প্রায়ই টাকা চাইত। অনেকের কাছেই সে টাকা ও খাবার চেয়ে বেড়াত। ‘মাকে খুন করে দিয়েছি’, এ কথা গত কয়েকমাসে সে চায়ের দোকানে গিয়ে অনেকবার বলেছে। কিন্তু, তারপরই সবাই দেখেন, মা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
কিন্তু, এদিনের আচরণ অন্য থাকায় সন্দেহ হয়েছিল দোকানদারের। খবর পেয়ে পুলিস পৌঁছয়। অফিসাররা ভিতরে ঢুকে দেখেন, দেহটি ড্রয়িংরুমে পড়ে রয়েছে। কিন্তু, মূল দরজা থেকে রক্তের দাগ। তদন্তে অনুমান, যখন ছেলে খুন করেছিল, তখন মা পালাবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু, পালাতে পারেননি। ধারালো ছুরি তাঁর গলা ও ঘাড়ের মধ্যবর্তী এলাকায় একাধিকবার কোপানো হয়েছে। চেয়ারেও রক্ত ভর্তি। বাড়িতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন! মৃতার মাথার পিছনে গভীর ক্ষত। খুনের সময় তাঁকে সজোরে মাটিতে ফেলে দেওয়ার জেরেই ওই ক্ষত বলে অনুমান। ওই ফ্ল্যাটের আশপাশে কোনও আবাসিক থাকেন না। ফলে, কেউ শব্দও পাননি। তদন্তে পুলিস জানতে পেরেছে, বৃহস্পতিবার রাত ১১-১২টা নাগাদ এই খুন হয়েছে। তারপর মায়ের মৃতদেহের সঙ্গেই সৌমিক ওই ফ্ল্যাটে ছিল। আত্মহত্যা সাজাতে মায়ের দেহের পাশে সে ছুরি নামিয়ে দিয়েছিল। মুছে নিয়েছিল নিজের গায়ের রক্ত।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন