নয়াদিল্লি: নিছক সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে নিয়ন্ত্রণ রেখার অন্য প্রান্তে থাকা জঙ্গি শিবির ধ্বংসের পুনরাবৃত্তি নয়। ভারত সরকার পহেলগাঁও কাণ্ডের প্রত্যাঘাতে চাইছে নির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদ। পহেলগাঁওয়ে হামলার পিছনেও যেহেতু বারংবার লস্কর-ই-তোইবা এবং জয়েশ-ই-মহম্মদেরই নাম উঠে এসেছে, তাই এবার ভারতের সামরিক অপারেশনের লক্ষ্য হতে পারে দুই টেরর মাস্টারমাইন্ড হাফিজ সইদ এবং মাসুদ আজহার। একজন লস্কর প্রধান, অন্যজন জয়েশ সুপ্রিমো। পহেলগাঁও হামলায় প্রথমেই এবার যে নামটা নিশ্চিতভাবে সামনে এসেছে, তা হল ফারুখ আহমেদ।
হাফিজ সইদের অন্যতম প্রধান কমান্ডারই এই হামলার মাস্টারমাইন্ড। পাক অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি শিবিরে নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে ফারুখই। আর সেখানে প্রশিক্ষণের দায়িত্বে থাকে জয়েশ ও লস্করের মিলিত কমান্ডো বাহিনী। সেই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলিতে মাঝেমধ্যেই যাতায়াত করে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও রেঞ্জার্সের আধিকারিকরা। জানা গিয়েছে, লাহোরের জোহর টাউনের দুর্গসম বাসভবন থেকে মার্চ মাসে হাফিজ সইদ গিয়েছিল অধিকৃত কাশ্মীরে। কতদিন সেখানে ছিল, জানার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এবং গুপ্তচর বাহিনী। সঙ্গে খোঁজ চলছে আরও প্রশ্নের। হাফিজ সইদের বর্তমান লোকেশন কোথায়? লাহোরের নিজস্ব বাসভবন? নাকি আইএসআইয়ের কোনও সেফহাউস? এই সন্ধান চালাচ্ছে গোয়েন্দারা। একইভাবে মৌলানা মাসুদ আজহারের ঠিকানা জানার চেষ্ঠায় রয়েছেন গোয়েন্দারা। ডিসেম্বর মাসে মাসুদের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। প্রায় ২২ দিন ছিল হাসপাতালে। এরপরও নাকি ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েকদিনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। কিন্তু ভাওয়ালপুরের নিজের মসজিদ ও মাদ্রাসা ঘেরা আস্তানায় সম্ভবত এখন সে নেই। তাহলে কোথায় আছে? এই প্রশ্নগুলি হঠাৎ ভারতের গোয়েন্দা ও গুপ্তচরদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কেন? কারণ, ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এবারের শপথ এবং নির্দেশ—বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সন্ত্রাসের এবার পরিসমাপ্তি হওয়া দরকার।
নরেন্দ্র মোদি কয়েকদিন
আগেই যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, সেটাই ভারতের সামরিক প্রত্যাঘাতের অভিমুখ স্থির
করছে। মোদি বলেছিলেন, ‘এই সন্ত্রাসের শিকড় উপড়ে ফেলা হবে। যেটুকু
সন্ত্রাসবাদ এদিক সেদিকে বেঁচে আছে, এবার তার সমাপ্তি ঘটতে চলেছে।’ মোদির
ওই বক্তব্য গালভরা বিবৃতি ছিল না। কারণ জানা যাচ্ছে, ঠিক সেই পথেই অগ্রসর
হবে সামরিক বাহিনী। অর্থাৎ টার্গেট হাফিজ সইদ ও মাসুদ আজহার। দু’জনেই
পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নিশ্ছিদ্র দুর্গে বাস করে। পাশাপাশি তাদের হাইড আউট
বারংবার বদলে যায়। তবে সম্ভবত দুই জঙ্গি প্রধানের লোকেশন বদলের স্যাটেলাইট
ইমেজ এবং তাদের অতীতের হাইড আউটের পূর্ণ তথ্য ভারতের হাতে রয়েছে। চেষ্টা
চলছে নিখুঁত তথ্য ও লোকেশন চিহ্নিত করার। এবার তৈরি হয়েই নামছে সামরিক
বাহিনী।
এই সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হওয়ার কারণ কী? বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে পহেলগাঁও নিয়ে আলোচনা এবং ভারতের কঠোর প্রত্যাঘাতের বার্তা—লাগাতার এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। আর তার থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হঠাৎ তালিবান সরকারকে ব্রিফ করেছে ভারতের অবস্থান। কাবুলে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের টিম তালিবান বিদেশমন্ত্রী মালওয়াল আমির খানের সঙ্গে দেখা করে। ভারতের পক্ষ থেকে জয়েন্ট সেক্রেটারি আনন্দ প্রকাশ এবং তালিবানি বিদেশমন্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি তালিবানকেও ভারত বার্তা দিয়েছে যে, এবার ভারত সরাসরি লস্কর এবং জয়েশের বিরুদ্ধে অলআউট অপারেশন করবে? তালিবান সরকারের নৈতিক সমর্থনও কি পেয়ে গিয়েছে ভারত? গত কয়েক বছর ধরেই পাকিস্তানি তালিবানের (তেহরিক-ই-তালিবান-পাকিস্তান) দাপটের কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের সম্পর্ক তিক্ত।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন