নয়াদিল্লি: অবশেষে সন্ত্রাসের শিকড়ে হানা। মঙ্গলবার মধ্যরাত। ঘড়িতে ১টা ২৮ মিনিট। পাকিস্তানের বাহওয়ালপুরে শোনা গেল প্রবল বিস্ফোরণের শব্দ। আর ঠিক তখনই ভারতীয় সেনার সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডলে ভেসে উঠল একটি বার্তা—‘প্রহরায় সন্নিহিতা... জয়ায় প্রকশিতায়া... রেডি টু স্ট্রাইক... ট্রেইনড টু উইন।’ সংকেত বাক্য। আসলে প্রতিজ্ঞাপূরণের শপথ। শুরুর মুহূর্ত কিন্তু সেটা ছিল না। কারণ, ততক্ষণে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘরে আছড়ে পড়েছে একের পর এক মিসাইল এবং স্মার্ট বম্ব। এয়ারস্ট্রাইকে নিশ্চিহ্ন হচ্ছে জয়েশ-ই-মহম্মদ, লস্কর-ই-তোইবা, হিজবুল মুজাহিদিনের জঙ্গি তৈরির কারখানাগুলি। রাত ১টা ৫১ মিনিটে ভারতীয় সেনা আবার ভেসে উঠল সোশ্যাল মিডিয়ায়।
এবার বার্তা— ‘পহেলগাঁও সন্ত্রাস হানা, অবশেষে বিচার! জয় হিন্দ’। ঘুমন্ত ভারতে তখন অনেকেই জেগে উঠেছে। আবেগে। উত্তেজনায়। ভারতবাসী জেনে গিয়েছে, অধিকৃত কাশ্মীর এবং পাকিস্তানে ছড়িয়ে থাকা ওই তিন সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের ৯টি আস্তানায় আঘাত হেনেছে ভারত। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সন্ত্রাসের ঠিকানা। পাকিস্তানের মাটিতে অথবা আকাশসীমায় প্রবেশ না করেই। রাত ১টা ৫ মিনিটে প্রথম মিসাইল নিক্ষেপ। রাত ১টা ৩০ মিনিটে সর্বশেষ গ্লাইড বম্ব। অপারেশন সমাপ্ত। রাফাল ফাইটার জেটবাহিত স্কাল্প মিসাইল এবং হ্যামার এয়ার টু গ্রাউন্ড বম্বের ধাক্কায় ২৫ মিনিটে আগুনে পুড়ছিল হাফিজ সইদ এবং মাসুদ আজহারের সন্ত্রাসের স্বর্ণলঙ্কা। পহেলগাঁও হামলার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘এবার জবাব এমন হবে, যা টান মারবে সন্ত্রাসের শিকড় ধরে।’ সেটাই করে দেখাল ভারতীয় বায়ুসেনা ও ভারতীয় সেনাবাহিনী। ‘প্রিসিশন টার্গেটেড স্ট্রাইকে’ ধূলিসাৎ জঙ্গি-রাজধানী।
এই ৯টি
স্থানকেই কেন বাছাই করে আঘাত হানা? যে মাদ্রাসা, যে মার্কাজ, যে মসজিদ, যে
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যভবনের আড়ালে চলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলিকে টার্গেট করা
হয়েছে, সেখান থেকেই উত্থান হয়েছে মুম্বই হামলার ডেভিড কোলম্যান হেডলি থেকে
আজমল কাসবের। তাহাউর রানা অথবা বিমান হাইজ্যাকার ইব্রাহিম আখতার, শাহিদ
আখতারদের। এমনকী সদ্য পহেলগাঁওয়ে ২৬ পর্যটককে হত্যা করা হাসিম মুসা, তাহা
আলিও এই ৯টি জঙ্গি কারখানারই কোনও একটির প্রোডাক্ট! এবং সর্বোপরি ভারত
বিরোধী সন্ত্রাসের দুই মাস্টারমাইন্ড হাফিজ সইদ এবং মাসুদ আজহারের
প্রত্যক্ষ ডেরা ছিল এই আস্তানাগুলি। ‘অপারেশন সিন্দুর’ কি সফল? সেই
প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে স্বয়ং মাসুদ আজহার। নিজেই জানিয়েছে, তার পরিবারের ১০
জন খতম। ডিসেম্বর মাসে হার্ট অ্যাটাক হওয়া মাসুদ আজহার বাহওয়ালপুরে ছিল
না। তাই রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু হাফিজ সইদের পুত্র তলহা সইদ কি আদৌ বেঁচে
আছে? সন্দেহের কারণ, ৯ জঙ্গিক্যাম্পের অন্যতম মুজফফরাবাদের ধূলিসাৎ হওয়া
আস্তানায় হয়তো সে ছিল! কিন্তু কোথায় সে? খোঁজ নেই।
মধ্যরাতে মিসাইল
হানায় ধূলিসাৎ বাহওয়ালপুরের মার্কাজ সুভান আল্লাহ। সেটা কী? মাসুদ আজহার,
মুফতি আবদুর রউফ আসগরের ডেরা। এখানেই হয়েছে পুলওয়ামার প্ল্যান। ২০০০ সালে
তৈরি পাঞ্জাবের মুরিদকে মার্কাজ তোইবা। বছরে এক হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়োগ
করা হয়। এখানে মসজিদ এবং গেস্ট হাউস তৈরির জন্য ১ কোটি টাকা দিয়েছে ওসামা
বিন লাদেন। এখানেই দৌরা-ই-রিব্বাত শিবিরে প্রশিক্ষণ নিয়েছে আজমল কাসব।
প্রশিক্ষক কে ছিল? জাকিউর রহমান লাখভি। মুম্বই হামলার প্ল্যানার। পাঞ্জাবের
শকড়গড় ব্লকের সরজাল তেহরা কালানের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ভবনের আড়ালে থাকা
তিনতলা বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের পর এখানে এনে রাখা হতো জঙ্গিদের
ভারতে অনুপ্রবেশের ঠিক আগে। শিয়ালকোটের জোয়া ভবন হিজবুল মুজাহিদিনের
কমান্ডার মহম্মদ ইরফান খানের। অস্ত্র জোগানের কারখানা। কোট জামেল রোডের
ভীমবের এমন একটি মার্কাজ... যেখানে একটি উইংয়ের নাম জম্মু-কাশ্মীর ইউনাইটেড
মুভমেন্ট। কাসিম গুজ্জর কমান্ডার। জম্মু সেক্টরে জঙ্গি পাঠানো তার কাজ।
ঠিক এরকমই পাক অধিকৃত কাশ্মীরের কোটলির মাসকার রহিল শাহিদ ভবন,
মুজফফরাবাদের শাহ নাল্লা ক্যাম্প, বিলাল ক্যাম্পেও ভারতের মিসাইল ও বোমা
পড়েছে।
পাকিস্তান এবার কী করবে? জাতীয় নিরাপত্তা বৈঠকের পর পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, ‘বদলা নেব’! আবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী
খাজা আসিফের সুর নরম। বলেছেন, ‘ভারত আর কিছু না করলে আমরা উত্তাপ বাড়াব
না।’ ভারত তৈরি। প্রিসিশন স্ট্রাইক শুরু। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের প্রস্তুতিও
কিন্তু সম্পূর্ণ। ওয়েস্টার্ন কমান্ডের ফরওয়ার্ড মুভমেন্ট নিছক সময়ের
অপেক্ষা!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন