কলকাতা: একাধিক গার্ল ফ্রেন্ড। দামি দামি গিফট। তাঁদের নিয়েই চলত রাতভর পার্টি। বিভিন্ন সময় ওই বান্ধবীদের নিয়ে বেড়াতে যেতেন তিনি। এন্টালিতে ২.৬৬ কোটি টাকা ডাকাতির ঘটনায় ধৃত এসটিএফের কনস্টেবল মিন্টু সরকারের রঙিন জীবন দেখে চোখ কপালে তদন্তকারীদের। এমনকী, অফিসারদের একাংশকে হাতে রাখতে মিন্টু তাঁদের নিয়মিত উপহার পাঠাতেন। শুধু তাই নয়, প্রতি সপ্তাহে কোথাও না কোথাও খানাপিনার ব্যবস্থাও করতেন অভিযুক্ত। সেখানে একমাত্র ঘনিষ্ঠদেরই প্রবেশাধিকার ছিল। তাঁর এই কাছের লোকজনকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। লুটের টাকা কোথায় রেখেছেন তিনি, তা তাঁকে জেরা করে জানার চেষ্টা চলছে।
এদিকে, এই ঘটনায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাথরপ্রতিমা থেকে আরও
তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিস। ধৃতদের নাম শাহনওয়াজ শেখ ওরফে রাজু, নাজমুল
হোসেন ও শেখ রহমত ওরফে রাজেশ। এরমধ্যে নাজমুল ও রহমত ফোরেক্স কোম্পানির
এজেন্ট। আর রাজু গাড়িতে করে টাকা নিয়ে যাওয়ার টিপস দিয়েছিল মিন্টুকে। এই
তিনজনকে জেরা করে মোট সাড়ে ৩১ লক্ষ টাকা উদ্ধার করেছে পুলিস।
কনস্টেবল
মিন্টুর বিরুদ্ধে তদন্তে নেমে অফিসাররা জানতে পারেন, জঙ্গি দমন বিভাগে কাজ
করার সূত্রে ‘টেরর ফান্ডিংকে’ চিহ্নিত করার দায়িত্ব ছিল তাঁর। বছর পাঁচেক
ধরে এই কাজ করায় কোন হাওলা রুটে জেহাদিদের টাকা যেত, তা জেনে গিয়েছিলেন
তিনি। কলকাতায় কারা কারা হাওলা কারবারের মাথা, তাঁদেরও চিনে গিয়েছিলেন
মিন্টু। চোখের সামনে এত টাকার লেনদেন দেখে লোভ সংবরণ করতে পারেননি এই
কনস্টেবল। এরপর তিনি টাকা হাতানোর ফন্দি আঁটেন। অভিযুক্ত তদন্তকারীদের
জানিয়েছেন, হাওলা কারবারিরা টাকা লুট হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই পুলিসের কাছে
অভিযোগ জানান। কারণ পুলিস টাকার উৎস জানতে চাইলে জালে জড়িয়ে পড়ার ভয় থাকে
তাঁদের। এই ফাঁককেই ব্যবহার করে হাওলার টাকা লুটের পরিকল্পনা করেন মিন্টু।
তৈরি করেন টিম।
এন্টালিতে প্রথম নয়, এর আগেও মিন্টু চার-পাঁচ বছর ধরে
এই কাজে হাত পাকিয়েছেন। তবে এবারের ‘ডিল’ ছিল ২.৬৬ কোটি টাকার। বিভিন্ন
হাওলা ব্যবসায়ীর মোবাইল ট্র্যাক করে তিনি জানতে পারতেন কবে, কোথায়, কত টাকা
লেনদেন হবে। সেইমতো খবর নিশ্চিত করতে সোর্সদের পাঠিয়ে দিতেন সেখানে। তবে
মূল অপারেশনে থাকতেন না মিন্টু। তাঁর টিমের লোকজনই পুলিস পরিচয় দিয়ে ভয়
দেখিয়ে লুট করত হাওলার টাকা। মাঝে মাঝে মিন্টু কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে
যেতেন বিভিন্ন হাওলা কোম্পানির অফিসে তল্লাশি করতে। লুট বা ডাকাতির পর সেই
টাকা সোর্সদের কাছেই রেখে দিতেন। তারপর সময়মতো অন্যত্র সরিয়ে ফেলতেন।
মিন্টু
জেরায় তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, প্রথম দিকে তিনি অল্প টাকা লুট করতেন।
পার্ক স্ট্রিট সহ বিভিন্ন জায়গায় এর আগে অপারেশন চালিয়েছেন তিনি। লোভ বেড়ে
যাওয়ায় এবার বড় অঙ্কের টাকা হাতানোর পরিকল্পনা করেন। যে কারণেই বেছে নেওয়া
হয়েছিল এন্টালিকে। তাঁর বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে
তাঁর সেকশনের অফিসারদের নজর এড়িয়ে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক্ষেত্রে
অফিসারদের কাউকে তিনি ‘ম্যানেজ’ করেছিলেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
প্রতি
সপ্তাহে বিভিন্ন ক্লাবে অফিসারদের একাংশকে নিয়ে পার্টি করতেন মিন্টু।
তাহলে কি ওই অফিসারদের মদত ছিল এই কাজে? এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছেন
তদন্তকারীরা। জেরায় মিন্টু জানিয়েছেন, দু’হাতে টাকা রোজগার করলেও তাঁর খরচ
ছিল বিশাল। একাধিক গার্ল ফ্রেন্ড ছিল। তাঁদের পরিবার চালাতে টাকা দিতেন
তিনি। এমনকী বান্ধবীদের আব্দার মেটাতে দামি দামি গিফটও দিতে হতো। জানা
গিয়েছে, কলকাতায় তাঁর তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। তিনি যে টাকা বেতন পান, তা দিয়ে
এই সম্পত্তি করা সম্ভব নয়। অনৈতিকভাবে রোজগারের টাকাতেই এই বিপুল
সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তিনি, সে বিষয়ে নিশ্চিত তদন্তকারীরা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন