চুঁচুড়া: পাকিস্তানে বন্দি দশা। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর দেশে ফেরা। অবশেষে শুক্রবার নিজের বাড়ি ফিরলেন হুগলির রিষড়ার বিএসএফ জওয়ান পূর্ণম সাউ। এদিন সন্ধ্যার মুখে বিপুল উন্মাদনায় হুডখোলা জিপে সাউনিবাসে পূর্ণমকে পৌঁছে দিয়ে গেল রিষড়ার নাগরিকদের মিছিল। রাইফেল ধরে অভ্যস্ত শক্তপোক্ত মনের এক জওয়ানের চোখে তখন জল। হাওড়া স্টেশনে নেমেও কেঁদে ফেলেছিলেন। ধরে আসা গলায় ভাঙা হিন্দি আর বাংলায় তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি। দেশের মানুষের প্রার্থনাতেই তা সম্ভব হয়েছে।’
রিষড়ার উচ্ছ্বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে
বেড়েছে সাউনিবাসের তৎপরতা। খবর এসেছিল বৃহস্পতিবারই। রজনী জেনেছিলেন,
বাড়িতে ফিরছে তাঁর ‘সিঁদুর’। রাত থেকেই দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
পূর্ণমের জন্য পছন্দের রান্না করতে শুরু করেছিলেন অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী।
অশক্ত শরীরেও সঙ্গ দিয়েছেন পূর্ণমের মা। ছোট্ট আরব পড়শিদের বাড়ি বাড়ি বলে
বেড়িয়েছিল, বাবা আসছে। সাউনিবাসের আনন্দ বহুগুণ হয়ে ছড়িয়েছিল পাড়ার
আনাচকানাচে। শুক্রবার ভিড়ের দোলায় দুলতে দুলতে যখন পূর্ণম বাড়ির
দোড়গোড়ায় পৌঁছলেন তখন শাঁখ বাজল, ঊলুধ্বনি হল। থিকথিকে ভিড় পেরিয়ে ঘরের
ছেলে ঘরে ফিরলেন। সন্তানের আলিঙ্গনে বাঁধা পড়লেন। মায়ের প্রৌঢ় হাত কপাল
ছুঁয়ে গেল। জওয়ানের বীরাঙ্গনা স্ত্রী স্বামীর মুক্তির জন্য ছুটে
বেরিয়েছিলেন প্রায় আসমুদ্রহিমাচল। প্রবল আবেগে একবার ফুঁপিয়ে উঠলেন। দ্রুত
সামলে নিয়ে শুরু হয়ে গেল কেক কাটার তৎপরতা। সাউনিবাসে তখন অকাল দেওয়ালির
মৌতাত। ২৩ এপ্রিল পাকিস্তানের হাতে বন্দি হয়েছিলেন পূর্ণম। তারপর দু’দেশের
মধ্যে হয়ে গিয়েছিল ছোট যুদ্ধ। ন’দিন আগে মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরেন রিষড়ার
জওয়ান। এবার ফিরলেন বাড়ি। ২৩ এপ্রিলের বৃত্ত সম্পূর্ণ হল ২৩ মে তারিখে।
দিল্লি-হাওড়া
পূর্বা এক্সপ্রেসে এদিন হাওড়া নামেন পূর্ণম। বেলা সওয়া পাঁচটায় স্টেশনে
পৌঁছন রিষড়া পুরসভার চেয়ারম্যান বিজয় মিশ্র, পূর্ণমের বাবা ভোলানাথ সাউ।
দেখা হতেই বাবাকে জড়িয়ে ধরেন ছেলে। বিজয়বাবুর উদ্যোগে ফেরার পথে লিলুয়াতে
হয় মিষ্টি মুখের উৎসব। প্রৌঢ় ভোলানাথ আদর করে ছেলেকে লর্ড চমচম খাইয়ে
দেন। পূর্ণম খাইয়ে দেন বিজয়বাবুকে। সেখানেই সাংবাদিকদের বলেন, ‘জওয়ানরা ভয়
পান না। সেটাই তাঁদের শিক্ষা। আমিও ভয় পাইনি। তবে আমার দ্বিতীয় জন্ম
হয়েছে।’ অনেক না বলা কথা হয়ত ‘দ্বিতীয় জন্মে’র উল্লেখ করেই বলে দিলেন দেশের
এক প্রশিক্ষিত জওয়ান। রিষড়ায় ফিরতেই ভিড় বাস্তবিকই কোলে তুলে নেয় তাঁকে।
বাঘখাল থেকে শুরু হয় নাগরিক মিছিল। তারপর সময় গড়িয়েছে। আনন্দ মাত্রাছাড়া
হয়েছে। শেষপর্যন্ত সব উচ্ছ্বাস এসে মিশেছে সাউনিবাসে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন