বর্ধমান: সেটাও ছিল মে মাস! সেদিনও মনুয়া নামে কেঁপে উঠেছিল বাংলার সঙ্গে গোটা দেশ। ঠিক যেভাবে আজ কাঁপছে সোনমের নামে! আসলে, মনুয়া-সোনমের গল্পটা অনেকটা একইরকম। তাই হয়তো বর্ধমান জেলে বন্দি মনুয়া মেঘালয় হত্যাকাণ্ডে আপ-টু-ডেট। কখনও তাঁর চোখ আটকে থাকে সংবাদপত্রে। আবার কখনও টিভির পর্দায়। তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে অগাধ কৌতূহল মনুয়ার। সোনম যেন বারবার তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে নিজের জীবনের অভিশপ্ত স্মৃতিকে। মনে পড়লে চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের জল। কখনও অস্ফুট স্বরে বলে উঠছে—‘উফ কী নির্মম, নৃশংস! এসবই স্বামীকে হত্যার অনুশোচনার বহিঃপ্রকাশ মনুয়ার। তার সম্পর্কে এমনটাই পর্যবেক্ষণ জেল আধিকারিকদের।
মনুয়া-সোনম দু’জনেই বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্ককে নির্ঝঞ্ছাট পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। মনুয়া অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে স্বামী নামক কাঁটাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। প্রেমিককে দিয়ে খুন করিয়েছিল স্বামীকে। সোনম সেই কাজটা করে পথের দোড়গোড়ায়। বিয়ের ঠিক ক’দিনের মাথায়। মধুচন্দ্রিমার সফরে প্রেমিককে সঙ্গে নিয়ে স্বামীকে খুন করে। যাকে পুলিসি ভাষায় বলা হচ্ছে ‘হানিমুন মার্ডার’। দু’জনেই অবশ্য হাড়হিম হত্যাকাণ্ডে ছিল ‘নন প্লেয়িং ক্যাপ্টেন’-এর ভূমিকায়। অর্থাৎ, পিছন থেকে সবকিছু তদারকি করা। মুনয়া স্বামীকে খুন করার প্লট তৈরি করে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে স্বামীর আর্তনাদ শুনতে চেয়েছিল। প্রেমিক মোবাইলে কল করে সেটা শুনিয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে আসে। স্বামী রাজ রঘুবংশীকে আততায়ীরা পিছন থেকে মাথায় অস্ত্রের আঘাত করেছিল, তখন পিছনে থেকে তাঁর শেষ আর্তনাদ সম্ভবত শুনেছিল সোনমও। সংবাদপত্রে এসব তথ্যই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছে মনুয়া।
কাকতালীয়ভাবে দু’টি হত্যাকাণ্ডই ঘটে মে মাসে। ২০১৭ সালের ২ মে। ঠাণ্ডা মাথায় প্রেমিককে দিয়ে স্বামী অনুপম সিংহকে খুন করায় মনুয়া। সেদিন তার নিমর্মতা দেখে শিউরে উঠেছিল গোটা বাংলা। নিজের ঘরেই খুন হয়েছিলেন অনুপম। প্রেমিক অজিত রায় স্বামীর মৃত্যু নিশ্চিত করতেই মুখে চওড়া হাসি ফুটেছিল মনুয়ার। সেই মনুয়া এখন সোনমের বর্বরোচিত কীর্তি দেখে শিহরিত, বিচলিত। আক্ষেপ করে বলছে, ‘এমনটা না হলেই ভালো হতো।’ দীর্ঘ প্রায় আট বছরের জেল-জীবনে অনেকটাই বদলে গিয়েছে মনুয়া। মঞ্চে নাটক থেকে শুরু করে সাময়িকীর সম্পাদনাও করছে সাফল্যের সঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মন-মানসিকতারও বদল হচ্ছে ধীরে ধীরে। জেলের এক আধিকারিক বলছিলেন, ‘মনুয়া আর সেই মনুয়া নয়। নিজেকে সম্পুর্ণ বদলে ফেলেছে। এখন সে কয়েদিদের নাচ শেখায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে। আগের ঘটনা ভুলে থাকতে চায়। নিজের কৃতকর্মের জন্য হামেশা অনুশোচনাও করে।’ জেল বন্দিদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন মেহেবুব হাসান। তাঁর কথায়, ‘এই তো কয়েক দিন আগেই আমরা নজরুল ইসলামের জন্মস্থান চুরুলিয়ায় অনুষ্ঠান করতে গিয়েছিলাম। সেখানে মনুয়াও গিয়েছিল। এখন সে অন্য রকম। নতুন করে বাঁচতে চায়। এটা শুভ লক্ষণ।’
বর্ধমান সংশোধনাগারের আর এক আধিকারিক বলছিলেন, জেলবন্দিরা যাতে সমাজের মূল স্রোতে ফিরতে পারে তারজন্য নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়। মনুয়া খুব ভালো নাচ জানে। অতীত ভুলে এক অন্যজগতে থাকতে চায় সে। সেই কারণেই হয়তো সোনমের কাহিনি তার চোখে জল আনে।’

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন