কলকাতা: জেলযাত্রার রায় শুনে আসামি কান্নায় ভেঙে পড়ছে—এমন দৃশ্য দেখতেই অভ্যস্ত মানুষ। কিন্তু সম্প্রতি উল্টো ঘটনার সাক্ষী থাকল বনগাঁ আদালত। বিচারকের আদেশ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লেও পরক্ষণেই সাজাপ্রাপ্ত বাংলাদেশি কিশোরী ধন্যবাদ জানালেন আদালতকে। বলে গেলেন, ‘এই সাজায় আমার বাবা নিশ্চিন্ত হল!’
কেন এই ‘উলটপুরাণ’? জানতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে বছর খানেক। গত বছরের আগস্ট। মাস। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি গোটা বাংলাদেশে। সরকার বিরোধী তুমুল বিক্ষোভে দেশ ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শাসক দল আওয়ামি লিগ কোণঠাসা। এমন সময় বাংলাদেশজুড়ে শুরু হল সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ। নানা কায়দায় ভীতি প্রদর্শন থেকে শারীরিক আক্রমণ। সংখ্যালঘুরা প্রমাদ গুনতে শুরু করলেন। কারও কারও স্মৃতিতে ফিরে এল ’৭১ পূর্ববর্তী সময়ের ভয়াবহ স্মৃতি। সেই আতঙ্কের আবহ এখন পুরোপুরি কেটে গিয়েছে, বলা যায় না। সেই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের বিশ্বাস পরিবার ভেবেছিল, নিজের দেশেই আর নিরাপদ নয় তাঁদের বাড়ির মেয়ে। তাই ঠিক হল, সদ্য অষ্টাদশীকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে কলকাতায় মাসির বাড়িতে। কিন্তু ভারতে যাওয়ার কোনও বৈধ কাগজপত্র নেই! তবুও আশা, একবার ভারতে ঢুকে পড়তে পারলে প্রাণ বাঁচবে। বাঁচবে সম্মানও। সেই মতো গত ডিসেম্বরে বৈধ নথি ছাড়াই ভারতে ঢুকতে গিয়ে বাগদা সীমান্তে ধরা পড়ে যান পূজা বিশ্বাস নামে ওই কিশোরী। অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা রুজু হয় তাঁর বিরুদ্ধে। সেই মামলায় সম্প্রতি আদালতে দোষ কবুল করেন পূজা। বনগাঁর দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক প্রদীপকুমার অধিকারীর এজলাসে কাঠগড়ায়
দাঁড়িয়ে তিনি বিচারকের সামনে ব্যাখ্যা দেন, কেন তিনি সেদিন বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে ঢুকতে চেয়েছিলেন। এই স্বীকারোক্তির পরই অনুপ্রবেশের দায়ে বিচারক তাঁকে চার বছর সশ্রম কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছ’মাস হাজতবাসের নির্দেশ দেন।
আদালত সূত্রের খবর, রায় শুনে প্রাথমিক অভিঘাতে কিশোরী কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিচারকের কাছে সাজা কমানোর আর্জিও রাখেন তিনি। বিচারক বলেন, ‘আপনি নিজেই দোষ স্বীকার করেছেন। আপনার বয়স সহ সমস্ত দিক পর্যালোচনা করেই আপনাকে আদালত এই সাজা দিয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপনি উচ্চ আদালতে যেতে পারেন। তার জন্য আপনি বিনা খরচে লিগ্যাল এইড থেকে আইনজীবী পেতে পারেন। মনে করলে জেল থেকেই আপনি লিখিতভাবে ওই আর্জি জানাতে পারবেন।’ আদালত সূত্রে খবর, এরপর আর কোনও আবেদন না রেখে জেলে যাওয়ার গাড়িতে উঠতে এগিয়ে যান পূজা। আদালত সূত্রে খবর, সেই সময় তিনি বলেন, ‘এই সাজায় আমার বাবা অন্তত নিশ্চিন্ত হল। আপাতত বাংলাদেশে ফিরতে হচ্ছে না, এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি। এখানকার জেলে অন্তত নিরাপদে থাকতে পারব!’
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বেআইনি অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল পূজাকে। পুলিস তদন্ত শেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে বনগাঁ মহকুমা আদালতে চার্জশিট পেশ করে। পরবর্তী সময়ে মামলাটি বিচারের জন্য যায় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতে। সেই মামলাতেই অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে এই আদেশ দেন বিচারক।
.jpeg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন