দৌলতাবাদ : “বিশ্বাসই করতে পারছি না, বেঁচে আছি। কীভাবে বাসের ভেতর থেকে বেরিয়ে, সাঁতরে পাড়ে উঠেছি, বলতে পারব না। কিছুই মনে নেই। তারপর তো ওঁরা এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। বার বার নিজের গায়েই হাত দিয়ে দেখছি, এই আমিটাই আসল আমি তো।”
সোমবার মুর্শিদাবাদের দৌলতাবাদে বাস দুর্ঘটনায় জীবিত এক মহিলা যাত্রী মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে শুয়ে এমন ভাষাতেই বর্ননা করলেন। এদিন সকালে দৌলতাবাদে সেতুর রেলিং ভেঙে একটি সরকারি বাস জলে পড়ে যায়। দীর্ঘ নয় ঘন্টার চেষ্টার পর বাসটিকে জল থেকে উদ্ধার করা হয়। বাস উদ্ধারের পর ৩২টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় ৩৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওযা গিয়েছে।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বর্ননা দিতে গিয়ে বলেন, “সকাল সওয়া ৬টা থেকে দাঁড়িয়েছিলাম পুরনো বিডিও অফিসের মোড়ে। পাশেই আমার বাড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব বলে মালদহের বাসের অপেক্ষা করছিলাম। সাড়ে ৬টা নাগাদ এই বাসটি এসেছিল। ভিড়ে ঠাসা। তার মধ্যেই সেঁধিয়ে গিয়েছিলাম। উঠেই বসার জায়গা পাইনি। সব সিট ভর্তি ছিল। অনেকে দাঁড়িয়েও ছিলেন। সব মিলিয়ে জনা ষাটেক মানুষ তো ছিলেনই।
মহিলাদের আসনে এক ভদ্রলোক বসেছিলেন। তিনিই উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে জায়গা দেন। বসে পড়ি। মোবাইলে গান শুনব বলে ব্যাগ থেকে হেডফোনটা বার করি। তার পর চোখ বন্ধ করে গানই শুনছিলাম। কতক্ষণ হবে ঠিক খেয়াল নেই। আপন মনেই গান শুনছিলাম। হঠাৎ করে একটা বিকট শব্দ। গানের আওয়াজ ছাপিয়ে কয়েকশো গুণ বেশি সেই শব্দে তাকিয়ে দেখি বাসটা শূন্যে উড়ছে। মুহূর্তেই জলের মধ্যে পড়ে যায় বীভৎস শব্দে। তার পর তলিয়ে যেতে শুরু করে। এর পর আর তেমন করে কিছু মনে নেই।
তবে, জলের ভিতরে একটা আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছিলাম। কনকনে ঠান্ডা জল। তবে বেশ স্বচ্ছ। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কিছুতেই শ্বাস নিতে পারছিলাম না। শুধু মনে আছে, ওই আলোকে লক্ষ্য করে হাত-পা ছুড়ছিলাম। সাঁতারটা জানতাম। সেই সময় কারা যেন আমার পা ধরে টানছিল। গাল, মুখ, হাত— সবখানেই অন্যদের শরীরের ঝাপটা লাগছে। কে যেন আঁকড়ে ধরতেও চেয়েছিল। কিন্তু, তার পরেও কী ভাবে যেন উপরে ভেসে উঠি। হাত-পা ছোড়াটা থামাইনি এক মুহূর্তের জন্য।”
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন